দামেস্কে দেয়াল ভেঙে ১৫ বছর পর উদ্ধার বাশার আল-আসাদের ভয়ে লুকিয়ে রাখা পারিবারিক গ্রন্থাগার

3 Min Read

২০১১ সালের গণবিক্ষোভের সময় নির্বাসনে যাওয়ার আগে নিষিদ্ধ বই ও নথিপত্র বাঁচাতে ঘরের ভেতর গোপন দেয়াল তৈরি করেছিলেন এক সিরীয় ব্যক্তি; স্বৈরশাসনের অবসানের পর অক্ষত অবস্থায় মিলল সেই অমূল্য সম্পদ।

সিরিয়ার সাবেক শাসক বাশার আল-আসাদের কঠোর সেন্সরশিপ ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ভয়ে ঘরের ভেতরে কৃত্রিম দেয়াল তুলে লুকিয়ে রাখা একটি দুর্লভ পারিবারিক গ্রন্থাগার দীর্ঘ দেড় দশক পর অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। ২০১১ সালে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ শুরুর প্রেক্ষাপটে দেশ ছেড়ে নির্বাসনে যাওয়ার আগে রাজধানী দামেস্কের বাসভবনে ওই গোপন প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল। সম্প্রতি দীর্ঘ ১৫ বছর পর সেই গোপন দেয়াল ভেঙে শত শত বই ও ঐতিহাসিক নথিপত্র উদ্ধার করেছে পরিবারটি। উদ্ধার অভিযানের আবেগঘন একটি ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে প্রকাশিত হওয়ার পর তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সিরীয় লেখক বিলাল আলৌন এবং তার পিতা আবু বিলালের এই রোমাঞ্চকর পারিবারিক উদ্যোগের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, হাতুড়ি দিয়ে কংক্রিটের তৈরি একটি পুরু দেয়াল ভেঙে ভেতরে লুকানো ব্যক্তিগত সংগ্রহশালার সন্ধান উন্মুক্ত করা হচ্ছে। ২০১১ সালের অক্টোবরের শেষভাগে রাজধানী দামেস্ক ছেড়ে কুয়েতে পাড়ি জমানোর ঠিক আগমুহূর্তে আবু বিলাল নিজের হাতে এই গোপন দেয়ালটি নির্মাণ করেছিলেন। তৎকালীন আসাদ সরকারের ভয়াবহ দমন-পীড়ন, গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিরোধী বা বুদ্ধিবৃত্তিক মতাদর্শের ওপর আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধ থেকে মূল্যবান বইগুলো রক্ষা করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

উদ্ধারকৃত এই পারিবারিক সংগ্রহশালায় আসাদ শাসনামলে নিষিদ্ধ ঘোষিত বহু রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণামূলক বই এবং সাময়িকী সংরক্ষিত ছিল। তৎকালীন পরিস্থিতিতে এসব বই বা দলিল নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট পরিবারের জন্য তা নিশ্চিত গ্রেপ্তার ও প্রাণনাশের হুমকি ডেকে আনতে পারত। বইয়ের পাশাপাশি ওই গোপন প্রকোষ্ঠে পবিত্র কোরআনের প্রাচীন সনদ (ইজাজাহ), মূল্যবান প্রশংসাপত্র, প্রার্থনার তসবিহ এবং কিছু গচ্ছিত অর্থও লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

দেয়াল ভেঙে ভেতরে প্রবেশের পর আবু বিলাল আবেগাপ্লুত কণ্ঠে স্মৃতিচারণ করে জানান, এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে যখন তারা ঘরবাড়ি ছেড়েছিলেন, তখন আদৌ তারা বেঁচে থাকবেন কি না কিংবা কোনো দিন জন্মভূমিতে ফিরতে পারবেন কি না—তা জানা ছিল না। তবে দীর্ঘ ১৫ বছর বন্ধ থাকার পরও সামান্য কিছু ধূলিকণা ছাড়া বই ও অন্যান্য সামগ্রীর কোনো ক্ষতি হয়নি। প্রতিকূল সময়ের মধ্যেও তাকভর্তি শত শত বই ও মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত অবস্থায় ফিরে পাওয়ায় তিনি গভীর সন্তোষ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

উল্লেখ্য, পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা আসাদ পরিবারের কঠোর শাসনের অবসান ঘটে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে, যখন সরকারবিরোধী বিদ্রোহী যোদ্ধারা রাজধানী দামেস্কের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রার মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ দেশ ছেড়ে রাশিয়ায় পালিয়ে যান। আসাদ সরকারের পতনের ফলে সিরিয়ায় দীর্ঘদিন পর স্বৈরাচারী সেন্সরশিপের অবসান ঘটে এবং নির্বাসিত নাগরিকদের অনেকেই এখন দেশে ফিরে নিজেদের ফেলে যাওয়া অতীত ও স্মৃতিচিহ্ন পুনরুদ্ধারে উদ্যোগী হচ্ছেন।


১৫ বছর পর দামেস্কের বাড়িতে দেয়ালের আড়ালে লুকানো পারিবারিক গ্রন্থাগার ফিরে পেলেন এক সিরীয় লেখক—আসাদের শাসনামলের সেন্সরশিপ থেকে বাঁচাতে ২০১১ সালে যা সিল করা হয়েছিল।

gulftoday

Share This Article