লিবিয়া থেকে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মারা যাওয়া ফকির মো. তাচিরের পরিচয় দীর্ঘ দুই মাস পর শনাক্ত হলেও ব্যয় বহনে অস্বীকৃতি জানিয়েছে কনস্যুলেট; ফলে মরদেহ স্বদেশে পাঠাতে এগিয়ে এসেছেন প্রবাসী ও স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা।
ভূমধ্যসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইউরোপগামী এক বাংলাদেশি অভিবাসীর মৃত্যুর পর দীর্ঘ দুই মাসেরও বেশি সময় জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অবশেষে তার নিথর দেহ স্বদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি বা কূটনৈতিক সহায়তার অভাবে ইতালির রাভেনা শহরের স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের যৌথ প্রচেষ্টায় এ মরদেহ বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে তহবিল সংগ্রহের কার্যক্রম চলছে।
নিহত ওই ব্যক্তির নাম ফকির মো. তাচির (Fakir Md Tachhir)। নথিপত্র অনুযায়ী, তার জন্ম ১৯৮৫ সালের ২৬ মে। উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় বিপজ্জনক সাগরপথ বেছে নিয়ে লিবিয়া উপকূল থেকে যাত্রা করার পর গত ১৩ মে আন্তর্জাতিক জলসীমায় তিনি প্রাণ হারান। এর পাঁচ দিন পর, অর্থাৎ ১৮ মে মানবিক সহায়তা সংস্থা এসওএস মেদিতেরােনির (SOS Méditerranée) উদ্ধারকারী জাহাজ ‘ওশান ভাইকিং’ (Ocean Viking)-এ করে তার মরদেহ ইতালির রাভেনা বন্দরে আনা হয়। সাগরে প্রাণ হারানো অভিবাসীদের পরিচয় শনাক্তে কাজ করা সিসিলির সংগঠন ‘মেমোরিয়া মেদিতেরােনিয়া’ (Memoria Mediterranea বা সংক্ষেপে Memmed) এবং রাভেনা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ স্কোয়াড্রা মোবিলের (Squadra Mobile) টানা দুই মাসের অনুসন্ধানে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ তাচিরের শেষকৃত্য বা মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়ে আগ্রহীদের কাছ থেকে আবেদন চেয়ে সরকারি নোটিশ বোর্ডে (albo pretorio) বিজ্ঞপ্তি দেয়। সংশ্লিষ্টদের আশা ছিল, এই পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে ইতালিপ্রবাসী বাংলাদেশ কনস্যুলেট নাগরিকের মরদেহ ফেরত নেওয়ার আর্থিক দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তবে ‘মেমমেদ’ সংগঠনের প্রতিনিধি জোভান্নি তেরানেও (Giovanni Terraneo) জানান, বাংলাদেশ কনস্যুলেট ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই ব্যয়ভার বহনে অপারগতা প্রকাশ করেছে। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই ব্যক্তি অননুমোদিত উপায়ে ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। যদিও বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পথেই তাচিরের মৃত্যু ঘটে এবং একটি উদ্ধারকারী জাহাজে করে নিথর দেহ হিসেবেই তিনি বন্দরে পৌঁছান। তেরানেও মন্তব্য করেন, তারা আশা করছেন এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং সম্ভবত বাংলাদেশের সমসাময়িক বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবের কারণে এমন সিদ্ধান্ত এসেছে।
কনস্যুলেটের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে মেমমেদ বিকল্প উপায় হিসেবে তাচিরের পরিবারের মাধ্যমে রাভেনার স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে। স্বজন ও স্থানীয় প্রবাসীরা তাৎক্ষণিকভাবে একটি তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেন, যাতে মরদেহ পাঠানোর সিংহভাগ খরচ মেটানো সম্ভব হয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করতে ওশান ভাইকিংয়ের পরিচালনাকারী সংস্থা এসওএস মেদিতেরােনির কাছেও সহযোগিতার আবেদন করা হয়েছে। মরদেহ বিমানে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ইতোমধ্যে একটি বিশেষায়িত ফিউনারেল এজেন্সির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত এপ্রিলে রাভেনার দারসেনা এলাকায় নির্মমভাবে নিহত গৃহহীন সেনেগালিজ নাগরিক মুসা সিসের মরদেহ ফেরত পাঠানোর দায়িত্বও সফলভাবে সম্পন্ন করেছিল এই একই এজেন্সি।
প্রবাসীদের এই সম্মিলিত উদ্যোগের ফলে তাচিরের মরদেহকে পৌরসভার অর্থায়নে পরিচালিত নিঃস্বদের জন্য নির্ধারিত সাধারণ বা নামমাত্র শেষকৃত্যের (funerali in economia) মুখে পড়তে হচ্ছে না। রাভেনা পৌরসভা ও স্থানীয় সেবা সংস্থা ‘আসের’ (Aser)-এর চুক্তির আওতায় প্রতি বছর এমন প্রায় ২০ জন বেওয়ারিশ বা নিঃস্ব ব্যক্তির শেষকৃত্যের জন্য জনপ্রতি প্রায় এক হাজার ইউরো বরাদ্দ থাকে। তবে প্রবাসীদের সহায়তায় তাচির শেষ পর্যন্ত নিজের জন্মভূমিতে সমাহিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে, উদ্ধার সংস্থা মেমমেদ জানিয়েছে যে সাগরে প্রাণ হারানোদের পরিচয় উদ্ধারের চ্যালেঞ্জ ক্রমেই বাড়ছে; সম্প্রতি মেসিনা বন্দরে ‘সলিদেয়ার’ (Solidaire) জাহাজে করে জল থেকে উদ্ধার হওয়া আরেকটি পরিচয়হীন মরদেহের স্বজনদের খোঁজে তারা নতুন করে কার্যক্রম শুরু করেছে।
রাভেনায় মৃত অবস্থায় পৌঁছানো বাংলাদেশি অভিবাসী ফকির মো. তাহিরের মরদেহ দেশে পাঠাতে বাংলাদেশি কমিউনিটি ও স্বেচ্ছাসেবীরা তহবিল সংগ্রহ করছেন; পরিচয় শনাক্তে লেগেছে দুই মাস।
ravennaedintorni


