সহপাঠীর ছুরি হামলা থেকে এক নারী শিক্ষিকার জীবন রক্ষা করায় রোমের কঙ্গো বংশোদ্ভূত এক কিশোর শিক্ষার্থীকে মন্ত্রণালয়ে ডেকে পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছেন ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা; অভিবাসী পটভূমির এক কিশোরের এমন দায়িত্বশীল আচরণ দেশটির নীতি-নির্ধারকদের মাঝে ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ইতালির রাজধানী রোমের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহপাঠীর প্রাণঘাতী ছুরিকাঘাত প্রতিহত করে শিক্ষিকার প্রাণ বাঁচিয়েছে কঙ্গো বংশোদ্ভূত এক শিক্ষার্থী। সহমর্মিতা ও সাহসিকতার এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করায় ওই শিক্ষার্থীকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে অভিবাসী পরিবারের এই কিশোরের প্রশংসনীয় ভূমিকা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় পন্তিদা শহরে ডানপন্থী রাজনৈতিক দল লেগার বার্ষিক এক সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা (Giuseppe Valditara) এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, সাহসিকতার পরিচয় দেওয়া ওই ছাত্রকে খুব শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এটি একটি অসাধারণ ও সুন্দর আচরণ। একজন মানুষ কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন তা কখনোই মুখ্য নয়, বরং সমাজের প্রতি তিনি কতটা নাগরিক দায়িত্ববোধ নিয়ে আচরণ করছেন—এই ঘটনাটি তারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার সকালে রোমের চেন্তোচেলে (Centocelle) এলাকার একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (স্কুওলা মেদিয়া)। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, শ্রেণি কার্যক্রম চলাকালে হঠাৎ ১৩ বছর বয়সী এক ছাত্র ছুরি বের করে তার নারী শিক্ষিকার ওপর আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। ক্লাসরুমে চরম ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিকভাবে কঙ্গো বংশোদ্ভূত ওই সহপাঠী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হামলাকারীকে বাধা দেয় এবং জাপটে ধরে নিরস্ত্র করে। ফলে কোনো হতাহতের ঘটনা ছাড়াই প্রাণে রক্ষা পান সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকা।

এই ঘটনায় নিরাপত্তা ঝুঁকি ও নেপথ্যের কারণ উদঘাটনে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে ইতালির সামরিক পুলিশ কারাবিনিয়েরি (Carabinieri)। তদন্তের অংশ হিসেবে হামলাকারী ১৩ বছর বয়সী কিশোর এবং তার মায়ের ব্যবহৃত মুঠোফোনে সাইবার বিশেষজ্ঞরা তল্লাশি চালিয়ে ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা উভয় ডিভাইসের ফরেনসিক প্রতিলিপি (কপিয়া ফরেনসে) তৈরি করেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, হামলায় ব্যবহৃত ছুরিগুলো কেনার ক্ষেত্রে ওই কিশোরের মায়ের মুঠোফোনে সংরক্ষিত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা হয়েছিল।
তদন্তকারীদের বরাতে জানা গেছে, হামলার পেছনে কোনো তৃতীয় পক্ষের উসকানি বা প্ররোচনা ছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে কিশোরটির সাম্প্রতিক কল ও বার্তা আদান-প্রদানের ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে, আক্রমণের ঠিক আগমুহূর্তে কিশোরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সরাসরি সম্প্রচার (লাইভ স্ট্রিমিং) চালু করেছিল। তার ওই সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টে মাত্র চারজন অনুসারী বা যোগাযোগ তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ছিলেন। ঘটনার আগে ওই চারজনের সঙ্গে কিশোরটির কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না এবং কেউ তাকে শিক্ষিকার ওপর আক্রমণে প্রলুব্ধ করেছিল কি না, তা এখন খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
ইতালিতে যখন অভিবাসন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে, তখন একজন অভিবাসী বংশোদ্ভূত কিশোরের সময়োপযোগী দৃঢ়তা ও মানবিক মূল্যবোধ পুরো সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা বয়ে এনেছে। আনুষ্ঠানিক তদন্ত অব্যাহত থাকার পাশাপাশি সরকারি সম্মাননা প্রদানের এই সিদ্ধান্ত ইতালীয় সমাজে নাগরিক দায়িত্ববোধের আদর্শ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রোমে ছুরিকাঘাতে শিক্ষিকাকে বাঁচানো কঙ্গো-বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীকে পুরস্কৃত করবেন শিক্ষামন্ত্রী ভালদিতারা। এদিকে, ১৩ বছর বয়সী হামলাকারীর মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গভীরভাবে তদন্ত করছে পুলিশ।
ansa


