ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নাগরিকদের আটলান্টিকের বিপজ্জনক পথে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া এক আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে স্পেনে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়া থেকে স্পেনের নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে অনিয়মিত অভিবাসী পাচারে যুক্ত একটি আন্তর্জাতিক চক্রের বিরুদ্ধে স্পেনের লাস পালমাস আদালতে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমাতে চাওয়া বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নাগরিকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়ে অনিরাপদ নৌকায় ভাসিয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে চক্রটির বিরুদ্ধে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই চক্রটির নেতৃত্বে ছিলেন মোহামেদ এসএস নামের ৫২ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি নাগরিক, যিনি সংশ্লিষ্ট মহলে ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিত। মৌরিতানিয়ায় একাধিক রেস্তোরাঁ পরিচালনার আড়ালে তিনি এই পাচার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। স্প্যানিশ আদালতের জারি করা আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট মৌরিতানিয়ায় তাঁকে আটক করা হয় এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্পেনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মৌরিতানিয়া, পশ্চিম সাহারা এবং মরক্কোর উপকূল থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশ্যে অন্তত ৭৩টি ঝুঁকিপূর্ণ নৌযান পাঠিয়েছিল চক্রটি। এসব নৌযানে আনুমানিক ৩ হাজার ৬০০ অভিবাসী ছিলেন, যাদের মধ্যে সাগরে নৌকাডুবিতে অন্তত ১৮০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ইউরোপে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চক্রের সদস্যরা জনপ্রতি প্রায় ১৩ হাজার ইউরো গ্রহণ করত। তবে বাস্তবে তাদের আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তাল ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য ছোট নৌকা বা রাবারের ডিঙিতে তুলে দেওয়া হতো। ক্যানারির এল হিয়েরো ও লানজারোতে পৌঁছাতে সক্ষম হওয়া ভুক্তভোগীরা জানান, যাত্রার পূর্বে মৌরিতানিয়ায় তাদের বন্দিশালায় চরম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। নির্ধারিত অর্থের বাইরে আরও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের জন্য অনেককে অপহরণ, মারধর এবং আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে হুমকি দেওয়া হতো।

এদিকে, একই চক্রের সহযোগী এসএম নামের অপর এক বাংলাদেশি নাগরিকের বিচারও আগামী সপ্তাহে একই আদালতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটন এবং অনিয়মিত অভিবাসনে সহায়তার দায়ে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর তাঁর চার বছর নয় মাসের কারাদণ্ড দাবি করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২১ ও ২০২২ সালে ফুয়ের্তেভেনতুরা ও গ্রান কানারিয়ায় পৌঁছানো তিনটি নৌকার বন্দোবস্তের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। ওই তিনটি নৌযানে মোট ১৬৬ জন অভিবাসী ছিলেন, যাদের মধ্যে ১৪ জন বাংলাদেশি এবং ৩ জন পাকিস্তানি নাগরিক ছিলেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, এসএম চক্রের আরেক শীর্ষ নেতা এইচএ এবং ‘মাস্টারমাইন্ড’-এর লজিস্টিক সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করতেন। মৌরিতানিয়ায় অবস্থানকালীন তিনি অভিবাসীদের জন্য নিজের নামে বাসা ভাড়া নিতেন এবং এর জন্য জনপ্রতি ২০০ ইউরো করে নিতেন। পরবর্তীতে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে তাদের নৌযাত্রার ব্যবস্থা করা হতো। এসএম ২০২২ সালের অক্টোবরে একটি ছোট নৌকায় চড়ে নিজে গ্রান কানারিয়ায় পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মাথায় গ্রেপ্তার হন। সেখানে আগে থেকে থাকা অভিবাসীরা তাঁকে পাচারকারী হিসেবে শনাক্ত করেন।
স্প্যানিশ পুলিশ এবং মৌরিতানিয়ার জন্দারমেরি বাহিনীর যৌথ তদন্তে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকার পাচারকারী চক্রগুলো এশিয়ায় তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে। যার ফলে ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকান অভিবাসীদের পাশাপাশি ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিকের মতো বিপজ্জনক নৌপথে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নাগরিকদের উপস্থিতিও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
স্পেনে বাংলাদেশি মানবপাচার চক্রের বিচার শুরু; ২০২১–২০২৫ সালে ৭৩টি নৌযানে ৩,৬০০ অভিবাসী পাঠানোর অভিযোগ, যাদের মধ্যে ১৮০ জনের সমুদ্রে মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের।
infomigrants


