হিজাবকে স্রষ্টার প্রতি ভক্তির নিদর্শন বললেন ইতালীয়ান ক্রিস্টিনা লেইলা

4 Min Read

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের ইচ্ছায় হিজাব পরিধান করা বোলোনিয়ার ৬২ বছর বয়সী ক্রিস্টিনা লামিয়েরি জানিয়েছেন, পর্দা কোনো পারিবারিক চাপ নয় বরং এটি একান্তই বিশ্বাস ও ব্যক্তি স্বাধীনতার বহিঃপ্রকাশ।

পশ্চিমা সমাজে মুসলিম নারীদের ধর্মীয় পোশাক, বিশেষ করে হিজাব বা পর্দা নিয়ে প্রায়ই নানা ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা যায়। রক্ষণশীলদের অনেকেই মনে করেন, পরিবারের পুরুষ সদস্য কিংবা ধর্মীয় অনুশাসনের চাপে পড়েই নারীরা পর্দা করতে বাধ্য হন। তবে এই প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন ইতালির নাগরিক ক্রিস্টিনা লামিয়েরি (মুসলিম নাম লেইলা)। তিন দশকেরও বেশি সময় আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা এই ইতালীয় নারী জানিয়েছেন, হিজাব তাঁর জীবনের কোনো বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি নিজের পছন্দে স্রষ্টার প্রতি গভীর আনুগত্য প্রকাশের এক বিশেষ মাধ্যম। দীর্ঘ জীবনে এই পছন্দের জন্য তাঁর মনে কখনোই কোনো অনুশোচনা বা দ্বিধার সৃষ্টি হয়নি।

ইতালির বোলোনিয়া প্রদেশের বাসিন্দা ৬২ বছর বয়সী ক্রিস্টিনা ১৯৯২ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁর স্বামী একজন লেবানিজ বংশোদ্ভূত প্রকৌশলী। এই দম্পতির সংসারে রয়েছে দুই সন্তান। তাঁদের বড় মেয়ের বয়স বর্তমানে ৪১ বছর এবং তিনি পেশায় একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ (গাইনোকোলজিস্ট)। ক্রিস্টিনা জানান, তাঁর মেয়েও মাত্র ১২ বছর বয়স থেকে সম্পূর্ণ নিজের সিদ্ধান্তে হিজাব পরিধান শুরু করেন। পারিবারিক অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি উল্লেখ করেন, ধর্মীয় পোশাক কখনোই কারো ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়; এটি প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরের তাগিদ ও নিজস্ব বোঝাপড়ার বিষয় হওয়া প্রয়োজন।

হিজাবের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ক্রিস্টিনা জানান, এটি কোনো স্বামী কিংবা পিতার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের পোশাক নয়, বরং একান্তই ঈশ্বরের প্রতি আত্মনিবেদন। এটিকে নারীর পরাধীনতা বা বশ্যতা হিসেবে চিহ্নিত করতে তিনি কঠোর আপত্তি জানান। তাঁর মতে, ইসলাম গ্রহণ ও হিজাব পরিধানের পর থেকে তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ ও আত্মিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এমনকি অন্যান্য মুসলিম দেশের কোনো নারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পর্দা না করার বিষয়েও তিনি উদার মনোভাব প্রকাশ করেন। প্রচলিত প্রবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, বাহ্যিক পোশাক দেখে মানুষের সামগ্রিক বিচার করা যায় না; পোশাকের বাইরেও মানুষ অনেক বেশি মানবিক ও যোগ্য হতে পারে।

তবে এই দীর্ঘ পথচলায় কর্মক্ষেত্রে তাঁকে প্রতিকূলতারও মুখোমুখি হতে হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে যখন তিনি একজন হোস্টেস হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখন হিজাবের কারণে কর্মক্ষেত্রে একধরনের অলিখিত কোণঠাসা পরিস্থিতির শিকার হন। গ্রাহক বা অতিথিদের মুখোমুখি হওয়ার বদলে কর্তৃপক্ষ তাঁকে প্রতিষ্ঠানের আড়ালে থাকা বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত করত। বিষয়টি তাঁকে আঘাত করলেও তিনি নিজের কাজে অবিচল ছিলেন। সে সময় তাঁর স্বামী তাঁকে বলেছিলেন, হিজাব যদি পেশাগত জীবনে বড় সংকট সৃষ্টি করে তবে তিনি চাইলে তা খুলে ফেলতে পারেন। তবে গভীর আত্মসমালোচনা শেষে ক্রিস্টিনা নিজের নীতিতে অটল থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং পর্দা বজায় রেখেই দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন। পরবর্তীতে সততা ও নিষ্ঠার কারণে কর্মক্ষেত্রের সেই পরিবেশও স্বাভাবিক হয়ে আসে।

ইতালিতে মুসলিম নারীদের ভাষা না জানা বা পুরো মুখ ঢাকা নিকাব ব্যবহারের ফলে সমাজে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা সম্পর্কেও নিজের অভিমত জানিয়েছেন ক্রিস্টিনা। তিনি স্বীকার করেন, স্থানীয় ভাষা না জানা এবং অতিরিক্ত আবৃত পোশাকের কারণে মধ্যবয়সী কিংবা প্রবীণ প্রজন্মের কারো কারো ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্বের কিছুটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে; তবে নতুন প্রজন্মে এই ধরনের বিচ্ছিন্নতা নেই বললেই চলে। তিনি জানান, দীর্ঘ জীবনে কোনো নারীকে জোরপূর্বক নিকাব পরতে বাধ্য করা হয়েছে—এমন ঘটনার মুখোমুখি তিনি কখনো হননি। এমনকি পুরো ইতালি জুড়ে তিনি নিজ চোখে মাত্র দু’জন নারীকে আফগান ধাঁচের বোরকা পরতে দেখেছেন; বাকি সবাই নিজস্ব রুচি অনুযায়ী সাধারণ হিজাব পরিধান করে থাকেন। ব্যক্তি স্বাধীনতা বজায় রেখে এবং স্থানীয় আইন মেনে সমাজের মূলধারায় যুক্ত থাকাই আধুনিক মুসলিম নারীদের প্রধান পরিচয় বলে তিনি মনে করেন।


ইতালীয় মুসলিম নারী ক্রিস্টিনা লামিয়েরি জানান, হিজাব তাঁর কাছে স্বামীর প্রতি আনুগত্য নয়; বরং আল্লাহর প্রতি ব্যক্তিগত ধর্মীয় ভক্তি ও আত্মনিবেদনের প্রকাশ।

quotidiano

Share This Article