ইতালির পালমা কাম্পানিয়ায় অভিবাসীদের ঘরে অভিযান: ৫০০-র বেশি মেট্রেস বাজেয়াপ্ত করলেন মেয়র

4 Min Read

আবাসন সংকটের নামে বাংলাদেশী অধ্যুষিত ‘বাংলা কাম্পানিয়া’ এলাকায় পৌর কর্তৃপক্ষের এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়।

ইতালির নেপলস (Naples) শহরের নিকটবর্তী পালমা কাম্পানিয়া (Palma Campania) পৌরসভায় প্রবাসী অভিবাসীদের ঘরের অতিরিক্ত জনবসতি বা গাদাগাদি করে থাকার ওপর বড় ধরনের ক্র্যাকডাউন বা অভিযান চালানো হয়েছে। পৌর এলাকার বাড়িগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত অভিবাসীদের গাদাগাদি করে থাকা বন্ধ করার উদ্দেশ্যে স্থানীয় মেয়র নেলো দোনারুম্মা (Nello Donnarumma)-র নির্দেশে ৫০০-র বেশি অতিরিক্ত মেট্রেস বা তোশক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এই কঠোর পদক্ষেপটির খবর এবং বাজেয়াপ্ত করা মেট্রেসের ছবি খোদ মেয়র নিজেই তাঁর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেছেন, যা স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

ঐতিহাসিকভাবে পালমা কাম্পানিয়া শহরটি ইতালির কাম্পানিয়া অঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম বাংলাদেশী প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী প্রবাসীর বসবাসের কারণে এই শহরটি স্থানীয়দের কাছে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলা কাম্পানিয়া’ (Bangla Campania) নামেও পরিচিতি লাভ করেছে। বছরের পর বছর ধরে এখানে বসবাসরত অভিবাসীদের আবাসন ও জীবনযাত্রা নিয়ে স্থানীয় ইতালীয় নাগরিকদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ ও মৃদু উত্তেজনা চলে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ডানপন্থী দল ‘ফ্রাতেল্লি দি’তালিয়া’ (Fratelli d’Italia – FdI)-র তরুণ মেয়র নেলো দোনারুম্মা এই অভিযান পরিচালনা করেন।

মেয়র ফেসবুকে বাজেয়াপ্তকৃত তোশকগুলো যেখানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে, সেই পৌর গুদামের ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, “আমাদের মিউনিসিপ্যাল পুলিশ (Polizia Municipale) এবং টেকনিক্যাল টিমের নিয়মিত পরিদর্শনের পর অতিরিক্ত হিসেবে পাওয়া এই মেট্রেসগুলো বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, গত এক বছরে প্রায় ৫০০টি অতিরিক্ত তোশক ও বিছানা তাদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। মেয়রের কড়া হুঁশিয়ারি ছিল, “আবাসিক এলাকায় গাদাগাদি করে থাকার বিরুদ্ধে আমাদের এই লড়াই আরও জোরদার হবে এবং তা কোনো বিরতি ছাড়াই চলবে। থমকে যাওয়া? কখনোই নয়।”

মেয়রের এই সাহসী ও আগ্রাসী পদক্ষেপের পর তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে সমর্থনের জোয়ার দেখা গেছে। অধিকাংশ ইতালীয় নাগরিক এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং পৌর প্রশাসনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এমনকি মন্তব্যকারীদের কেউ কেউ আরও চরমপন্থী মনোভাব প্রকাশ করে দাবি তুলেছেন যে, শুধু তোশক বাজেয়াপ্ত করাই যথেষ্ট নয়, বরং এই শহর থেকে বাংলাদেশী অভিবাসীদের চূড়ান্তভাবে সরিয়ে দেওয়ার জন্য আরও কঠোর ও বৈপ্লবিক আইন প্রয়োগ করা দরকার।

তবে এই প্রশংসার জোয়ারের বিপরীতে শহরটির নাগরিকদের পক্ষ থেকে কিছু যৌক্তিক এবং মানবিক সমালোচনাও উঠে এসেছে। ‘পিয়েত্রো সি’ (Pietro C.) নামক একজন স্থানীয় নাগরিক মেয়রের ফেসবুক পোস্টে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তুলনা টেনে মন্তব্য করেছেন। তিনি লিখেছেন, “আজ মেয়রের ওই গুদামে চাইলে আমার দাদা-দাদীর মেট্রেসগুলোও ঠাঁই পেতে পারত। কারণ আমার সাত চাচা-ফুফুসহ মোট নয় জনের পরিবার মাত্র ৫০ বর্গমিটারের একটি ছোট্ট ঘরে বসবাস করত।”

তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান ইতালি নিজের অতীত সংগ্রাম এবং লড়াইয়ের শিকড় ভুলে গেছে। রাজনৈতিক প্রচারণার স্বার্থে আজ অভিবাসীদের সংখ্যাকে একমাত্র প্রধান ‘সমস্যা’ হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে, যা দেশের প্রকৃত সংকটগুলো থেকে সাধারণ জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে সরিয়ে দেওয়ার একটি অপকৌশল মাত্র। এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ইতালির অভিবাসন নীতি এবং প্রবাসীদের আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে দেশটির স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন নাগরিক সমাজের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বান্দ্বিকতা বেড়েই চলেছে।


নেপলসের পালমা কাম্পানিয়ায় অতিরিক্ত আবাসন মোকাবিলায় গত এক বছরে প্রায় ৫০০টি অতিরিক্ত বিছানা জব্দ করেছে পৌরসভা; পদক্ষেপটি ব্যাপক সমর্থনের পাশাপাশি অভিবাসীবিরোধী সমালোচনাও সৃষ্টি করেছে।

ansa

Share This Article