ইতালির পোস্ট অফিসে নিকাব খুলতে বাধ্য করার অভিযোগ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণীর: দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক

4 Min Read

গাল্লারাতে শহরের একটি ডাকঘরে আইনি শনাক্তকরণের নামে মুসলিম তরুণীকে অপমানের অভিযোগ; ঘটনার প্রেক্ষিতে জনসমাগমস্থলে নিকাব নিষিদ্ধের দাবি তুলছেন রাজনীতিবিদরা।

ইতালির লম্বার্দিয়া অঞ্চলের ভারেজে (Varese) প্রদেশের গাল্লারাতে (Gallarate) শহরের একটি পোস্ট অফিসে নিকাব (Niqab) পরিহিত এক তরুণীর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটিতে নতুন করে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ভুক্তভোগী তরুণী ইতালীয় নাগরিক এবং জাতিগতভাবে তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। তার অভিযোগ, পোস্ট অফিসের একজন কর্মী তাকে ধর্মীয় পোশাক নিকাব খুলে মুখ উন্মুক্ত করতে বাধ্য করেছেন এবং তার সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছেন।

অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘ফ্যানপেজ’ (Fanpage)-এর বরাতে জানা গেছে, ওই তরুণী প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাজের জন্য পোস্ট অফিসের একটি শাখায় গিয়েছিলেন। তার দাবি অনুযায়ী, কাউন্টারে থাকা একজন কর্মী তাকে অত্যন্ত রূঢ়ভাবে বলেন, “যদি এখানে থাকতে চাও, তবে ওটা (নিকাব) খোলো।” তরুণী এই আচরণে অপমানিত বোধ করেন। তিনি জানান, প্রায় এক মাস পর পুনরায় একই অফিসে গেলে তাকে আবারও একই ধরণের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। তরুণীর মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া ছিল না, বরং তার ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত এবং সুস্পষ্ট বৈষম্য।

এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইতালির জাতীয় ডাক পরিষেবা সংস্থা ‘পোস্তে ইতালিয়ানে’ (Poste Italiane) একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করেছে। সংস্থাটি কোনো ধরণের বৈষম্যের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, গাল্লারাতে অফিসের কর্মীরা প্রচলিত আইন অনুযায়ী সঠিক শনাক্তকরণ (Identification) প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জনসমক্ষে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পরিচয় নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ওই তরুণীকে নিয়মিত সেবা প্রদান করা হয়েছিল এবং এতে কোনো আইনি ব্যত্যয় ঘটেনি।

এদিকে, এই ঘটনাটি ইতালির রাজনৈতিক অঙ্গনেও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। কট্টর ডানপন্থী দল ‘লিগা’ (Lega)-এর ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য ইসাবেলা তোভাগলিয়েরি (Isabella Tovaglieri) এই ঘটনার প্রেক্ষিতে জনসমাগমস্থলে নিকাব নিষিদ্ধ করার জোর দাবি তুলেছেন। তিনি বলেন, “ফ্রান্সের মতো ইতালিতেও সব পাবলিক স্পেসে নিকাব নিষিদ্ধ করা উচিত। সরকারি দপ্তরে মুখ ঢেকে প্রবেশ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি কেবল নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং এটি একটি সামাজিক শিষ্টাচার বা সভ্যতার অংশ।”

বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ইতালীয় নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে অনেক নেতিবাচক ও বর্ণবাদী মন্তব্য লক্ষ্য করা গেছে। আনসা (Ansa) নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক ব্যবহারকারী ওই পোস্ট অফিস কর্মীর আচরণকে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে কিছু মন্তব্য ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক; যেখানে তরুণীকে ‘নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার’ আহ্বান জানানো হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে হুমকিও প্রদান করা হয়েছে।

ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং মুসলিম নারী যারা নিকাব বা হিজাব পরিধান করেন, তাদের জন্য এই ঘটনাটি বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতালির আইন (আইন নং ১৫২/১৯৭৫) অনুযায়ী, বিশেষ কারণ ছাড়া জনসমক্ষে মুখ ঢেকে রাখা নিষিদ্ধ। তবে ধর্মীয় কারণে নিকাব পরা যাবে কি না, তা নিয়ে প্রায়ই আইনি ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়। এই ঘটনার পর দেশটিতে ধর্মীয় স্বাধীনতা বনাম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা আবারও নতুন মোড় নিয়েছে। আদালতের চূড়ান্ত কোনো নির্দেশনা বা নতুন আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত এ ধরণের বিতর্ক চলতেই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

ইতালির গাল্লারাতে নিকাব পরা এক তরুণীকে মুখ খোলার অনুরোধ নিয়ে বিতর্ক; পোস্টে ইতালিয়ানে পরিচয় যাচাইয়ের আইনি প্রক্রিয়া বললেও, ঘটনাটি বৈষম্য, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

nicolaporro

Share This Article