অ্যাড্রিয়াটিকের রূপসৌন্দর্য থেকে মুসোলিনির রোম, বিশ্বকবির ঐতিহাসিক ইতালি সফরের শতবর্ষে ফিরে দেখা সেই ঘটনাবহুল দিনগুলো, যেখানে স্বৈরশাসকের রাজকীয় আতিথেয়তা ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মানবতার দৃঢ় নৈতিক অবস্থান।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐতিহাসিক ইতালি সফরের শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে। ১৯২৫ এবং ১৯২৬ সালে দুই দফায় ইতালি ভ্রমণ করেছিলেন নোবেলজয়ী এই সাহিত্যিক। প্রাচীন রোমান ঐতিহ্য, শিল্প ও সাহিত্যের টানে শুরু হওয়া সেই সফর একদিকে যেমন ভেনিসের অনন্য রূপ বর্ণনায় মুগ্ধতার জন্ম দিয়েছিল, তেমনি অন্যদিকে তৎকালীন ইউরোপের উগ্র রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কবির আপসহীন প্রতিবাদের এক আন্তর্জাতিক দলিল হয়ে উঠেছিল।
১৯২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনা থেকে সমুদ্রপথে ইতালির জেনোয়া বন্দরে অবতরণ করেন রবীন্দ্রনাথ। রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারততত্ত্ব ও সংস্কৃতের অধ্যাপক কার্লো ফর্মিকির একক প্রচেষ্টায় কবির এই সফরটি বাস্তবায়িত হয়েছিল। ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম সফরটি সংক্ষিপ্ত হলেও মিলানে বসে কবি রচনা করেন বিখ্যাত কবিতা ‘ইটালিয়া’, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর ‘পূরবী’ কাব্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর ২৯ জানুয়ারি তিনি ভেনিসে পৌঁছালে স্থানীয় ছাত্র-জনতা ‘শান্তি ও প্রেমের কবি দীর্ঘজীবী হোন’ স্লোগানে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। ভেনিসের ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড হোটেলে অবস্থানকালে পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে নিয়ে কবি ঘুরে দেখেন স্থানীয় উপহ্রদ, ম্যুরানো দ্বীপের কাচশিল্প এবং বুড়ানোর সূচিকর্ম।
ভেনিস সফরকালে স্থানীয় দৈনিক ‘ইল গ্যাজেটিনো ডি ভেনেৎসিয়া’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শহরটিকে ‘অ্যাড্রিয়াটিকের রানী’ আখ্যা দিয়ে ভারতের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নগরী বারাণসীর সাথে এর তুলনা টানেন কবি। তবে ইতালি ত্যাগের প্রাক্কালে ৩ ফেব্রুয়ারি ‘কুরিয়ের দেলা সেরা’ পত্রিকায় দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় আধুনিক পর্যটকদের অগভীর দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে তিনি মধ্যযুগের পর্যটক মারকো পোলোর মতো মানুষের আত্মার সংযোগ খোঁজার তাগিদ দেন।

প্রথম সফরের অতৃপ্তি ঘোচাতে ঠিক ১৮ মাস পর, ১৯২৬ সালের ৩০ মে দ্বিতীয় দফায় ইতালির নেপলসে পৌঁছান কবিগুরু। তবে এ যাত্রাটি ছিল স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির সরাসরি সরকারি আমন্ত্রণে। ৩১ মে রোমের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন পালাৎসো কিজিতে মুসোলিনির সাথে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ হয়। তৎকালীন সময়ে ইতালির অভ্যন্তরীণ ফ্যাসিবাদী নিষ্ঠুরতার বাস্তব চিত্র কবির কাছে অনেকটাই অপ্রকাশিত ছিল। ফলে ২ জুন ‘দ্য নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড’ পত্রিকায় মুসোলিনির ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করে কবির বক্তব্য প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে প্রবল বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
পরবর্তীতে বিশিষ্ট ফরাসি লেখক রোমা রোঁলাসহ আন্তর্জাতিক বন্ধুদের হস্তক্ষেপে মুসোলিনির দমননীতির আসল রূপ উন্মোচিত হলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভুল বুঝতে পারেন। এরপর ভিয়েনায় বসে ২০ জুলাই বন্ধু চার্লস অ্যান্ড্রুজকে তিনি একটি দীর্ঘ চিঠি পাঠান, যা ৫ আগস্ট যুক্তরাজ্যের ‘ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় ‘ফিলোসফি অব ফ্যাসিজম: রিফিউজাল অব সাপোর্ট’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। সেখানে কবি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, যে আন্দোলন মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নির্মমভাবে দমন করে এবং রক্তের পথ বেয়ে চলে, তাকে সমর্থন করা অসম্ভব। অধ্যাপক ফর্মিকিকে পাঠানো পৃথক এক চিঠিতে ফ্যাসিবাদের প্রচারণাকে তিনি ‘নৈতিক আত্মহনন’ বলে অভিহিত করেন।
রবীন্দ্রনাথ ইতালি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো ভ্রমণগ্রন্থ রচনা না করলেও তাঁর ইতালি সফরের এই ঐতিহাসিক অধ্যায় প্রমাণ করে—শিল্পের অনুরাগী হলেও মানবতার প্রশ্নে তিনি কখনো আপস করেননি। শতবর্ষ পেরিয়েও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কবির সেই স্পষ্ট উচ্চারণ বিশ্ব রাজনীতি ও মুক্তচিন্তার ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের ইতালি সফরের শতবর্ষে উঠে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—মুসোলিনির আতিথেয়তা গ্রহণ করেও ভুল বুঝতে পেরে তিনি শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন।
prothomalo


