জার্মান মানবিক সংস্থা ‘সি-আই’ এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘এসওএস মেদিতেরানে’ পরিচালিত দুটি জাহাজে লিবিয়া ও মাল্টা উপকূলে পৃথক অভিযানে ১৫৩ জন অভিবাসীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে; চরম অনাহার ও রাসায়নিক ক্ষতে কাতর ছিলেন সাগরে ভাসমান এসব যাত্রী।
ইউরোপে পৌঁছানোর বিপজ্জনক সমুদ্রপথ ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর মুখ থেকে দেড় শতাধিক অভিবাসীকে জীবিত উদ্ধার করেছে আন্তর্জাতিক বেসরকারি মানবিক সংস্থা ‘সি-আই’ (Sea-Eye) এবং ‘এসওএস মেদিতেরানে’ (SOS Mediterranee)। চলতি অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে লিবিয়া ও মাল্টার তল্লাশি ও উদ্ধার অঞ্চলে সংস্থা দুটির উদ্ধারকারী জাহাজ যথাক্রমে ‘সি-আই ৫’ (Sea-Eye 5) এবং ‘ওশান ভাইকিং’ (Ocean Viking) পৃথক চারটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করে। প্রতিকূল সাগরে দিনের পর দিন তীব্র ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও চরম অনিশ্চয়তায় ভেসে থাকা মোট ১৫৩ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করে জরুরি মানবিক ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেছে এই দুই সংস্থা।
জার্মান সংস্থা ‘সি-আই’-এর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘সি-আই ৫’ অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহান্তে লিবিয়ার উপকূলে প্রথম উদ্ধারকাজ চালায়। নৌযান সংকটে পড়ার জরুরি বার্তা পেয়ে ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছে একটি ঝুঁকিপূর্ণ রাবার বোট থেকে ২০ থেকে ২৪ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করেন সি-আইয়ের কর্মীরা। এর পরদিনই মাল্টার জলসীমায় বিপদগ্রস্ত আরেকটি অনিরাপদ নৌযান থেকে অন্তত ৩২ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করে জাহাজটি। সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে, সি-আই ৫ জাহাজে আশ্রয় পাওয়া মোট ৫২ জনের বেশি অভিবাসীকে গত ৬ অক্টোবর নিরাপদে ইতালির বন্দরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে উদ্ধারকৃতদের জাতীয়তা বা পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করেনি সি-আই কর্তৃপক্ষ।

অপরদিকে, ইউরোপীয় মানবাধিকার সংস্থা ‘এসওএস মেদিতেরানে’ পরিচালিত জাহাজ ‘ওশান ভাইকিং’ গত ৬ ও ৭ অক্টোবর রাতে আরও ১০১ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করে। অভিবাসন নজরদারি প্ল্যাটফর্ম ‘অ্যালার্ম ফোন’ এবং ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের (Frontex) ড্রোন নজরদারির তথ্যের ভিত্তিতে লিবিয়া উপকূলে প্রথম অভিযানটি পরিচালনা করে এসওএস মেদিতেরানে। সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া ৬০ জনের মধ্যে ২১ জন নারী ও ১২ জন শিশু ছিল। এসওএস মেদিতেরানের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া নারীদের মধ্যে পাঁচজন অন্তঃসত্ত্বা এবং শিশুদের মধ্যে চারজন ছিল অভিভাবকহীন। এর কয়েক ঘণ্টার মাথায় মাল্টা অঞ্চলে আংশিক বাতাস বেরিয়ে যাওয়া অপর একটি নৌকা থেকে আরও ৪১ জনকে উদ্ধার করে ওশান ভাইকিং, যাদের মধ্যে ১৬ জন ছিল একা আসা অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর।
উদ্ধার তৎপরতা শেষে এসওএস মেদিতেরানে ও সি-আইয়ের উদ্ধারকারী দল জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা সাগরে টানা কয়েক দিন তীব্র খাদ্য ও সুপেয় পানির অভাবে ভুগছিলেন। সমুদ্রের নোনা পানির সঙ্গে নৌকার ইঞ্জিনের জ্বালানি তেল মিশে তৈরি হওয়া ক্ষতিকর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অনেকের শরীর মারাত্মকভাবে ঝলসে গেছে। এসওএস মেদিতেরানের কর্মীদের কাছে সুদান থেকে আসা এক তরুণ জানান, ক্ষুধার তীব্রতায় তিনি সাগরে জ্ঞান হারানোর পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। নিজ দেশে সহিংসতা থেকে বাঁচতে তিনি মিসর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান। তবে ইউরোপের উদ্দেশ্যে নৌকায় ওঠার আগে লিবিয়ায় দফায় দফায় মারধর, কারাবাস ও অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন বলে এসওএস মেদিতেরানেকে বর্ণনা করেন ওই তরুণ।
ভূমধ্যসাগরে ‘সি-আই’ ও ‘এসওএস মেদিতেরানে’-র মতো কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা নিয়মিত উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে নিয়মিত প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কোনো প্রকার নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে ছোট নৌকায় তিন শতাধিক কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন অভিবাসীরা। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম-এর (IOM) ‘নিখোঁজ অভিবাসী প্রকল্প’ (Missing Migrants Project) অনুসারে, চলতি ২০২৬ সালেই এই ঝুঁকিপূর্ণ রুটে সাগরে ডুবে নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজারে পৌঁছাতে চলেছে। এছাড়া ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩৫ হাজার মানুষ। তবে বহু নৌডুবির ঘটনা নথিভুক্ত না থাকায় প্রকৃত প্রাণহানি আরও অনেক বেশি বলে সতর্ক করেছে এসওএস মেদিতেরানে ও সি-আই কর্তৃপক্ষ।
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ভূমধ্যসাগরে ‘সি-আই ৫’ ও ‘ওশান ভাইকিং’ উদ্ধারকারী জাহাজের অভিযানে অন্তত ১৫৩ জন অভিবাসী প্রাণে বাঁচেন; ২০২৬ সালে এই পথে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২,০০০ ছুঁইছুঁই।
infomigrants


