আশির দশকের তুলনায় বয়োবৃদ্ধদের অনুপাত প্রায় তিনগুণ বাড়লেও চরম বৈষম্যের শিকার অভিবাসী তরুণরা; ভীতি ও কুসংস্কার দূর করে আন্তঃপ্রজন্ম সংহতি গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা।
ইউরোপে পৌঁছানোর বিপজ্জনক সমুদ্রপথ ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর মুখ থেকে দেড় শতাধিক অভিবাসীকে জীবিত উদ্ধার করেছে আন্তর্জাতিক বেসরকারি মানবিক সংস্থা ‘সি-আই’ (Sea-Eye) এবং ‘এসওএস মেদিতেরানে’ (SOS Mediterranee)। চলতি অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে লিবিয়া ও মাল্টার তল্লাশি ও উদ্ধার অঞ্চলে সংস্থা দুটির উদ্ধারকারী জাহাজ যথাক্রমে ‘সি-আই ৫’ (Sea-Eye 5) এবং ‘ওশান ভাইকিং’ (Ocean Viking) পৃথক চারটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করে। প্রতিকূল সাগরে দিনের পর দিন তীব্র ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও চরম অনিশ্চয়তায় ভেসে থাকা মোট ১৫৩ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করে জরুরি মানবিক ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেছে এই দুই সংস্থা।
জার্মান সংস্থা ‘সি-আই’-এর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘সি-আই ৫’ অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহান্তে লিবিয়ার উপকূলে প্রথম উদ্ধারকাজ চালায়। নৌযান সংকটে পড়ার জরুরি বার্তা পেয়ে ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছে একটি ঝুঁকিপূর্ণ রাবার বোট থেকে ২০ থেকে ২৪ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করেন সি-আইয়ের কর্মীরা। এর পরদিনই মাল্টার জলসীমায় বিপদগ্রস্ত আরেকটি অনিরাপদ নৌযান থেকে অন্তত ৩২ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করে জাহাজটি। সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে, সি-আই ৫ জাহাজে আশ্রয় পাওয়া মোট ৫২ জনের বেশি অভিবাসীকে গত ৬ অক্টোবর নিরাপদে ইতালির বন্দরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে উদ্ধারকৃতদের জাতীয়তা বা পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করেনি সি-আই কর্তৃপক্ষ।

গবেষণায় ইতালির বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতার ওপর জোর দিয়ে অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার কথা তুলে ধরা হয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইতালিতে বসবাসরত বিদেশি বংশোদ্ভূত শিশুদের মাঝে চরম দারিদ্র্যের হার ৪৩.৭ শতাংশ, যা স্থানীয় ইতালীয় শিশুদের (৯.৭ শতাংশ) তুলনায় চার গুণেরও বেশি। এছাড়া সার্বিকভাবে দেশটির ৬৭.৪ শতাংশ তরুণ এখনও মা-বাবার সঙ্গে একান্নবর্তী পরিবারে বসবাস করছেন। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও কাজের সুযোগের অভাবে বিপুলসংখ্যক দক্ষ তরুণ দেশ ছাড়ায় মেধা পাচারের সংকট তীব্রতর হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
ফোন্দাসিওনে মিগ্রান্তেসের মহাপরিচালক মনসিনিয়র পিয়েরপাওলো ফেলিকলো অভিবাসন নীতিতে তথাকথিত ‘ভীতির রাজনীতি’ ও কুসংস্কার পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অভিবাসনকে অমূলক আশঙ্কার চোখে না দেখে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে বিবেচনা করা উচিত। তিনি মানবিক ঐতিহ্য বজায় রেখে অভিবাসীদের সমাজ বিনির্মাণের অংশীদার হিসেবে গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাসের ধরনে পরিবর্তন এসেছে; তরুণদের মাঝে ক্যাথলিক ধর্মের অনুসারী কমে ৩৩.৭ শতাংশে নেমেছে। তবে পারিবারিক বন্ধন ও স্মৃতির মাধ্যমে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সংস্কৃতি এখনও বিদ্যমান।
সংকট সমাধানের পথ হিসেবে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আন্না মারিয়া তারান্তোলা প্রজন্ম ও বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি ‘নতুন সামাজিক চুক্তি’ (Patto sociale) গড়ে তোলার সুপারিশ করেছেন। তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবারে সম্পর্কের উন্নয়নমূলক শিক্ষার পাশাপাশি তরুণ ও প্রবীণদের যৌথ আবাসন বা ‘কো-হাউজিং’ (Co-housing)-এর প্রস্তাব দেন। এ ধরনের উদ্যোগে প্রবীণরা যেমন তরুণদের কাছে সেবা ও একাকীত্ব মুক্তির সুযোগ পাবেন, তেমনি তরুণরাও প্রবীণদের জ্ঞান ও দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতে পারবে। গবেষকদের মতে, সম্পদ বণ্টন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিহার করে পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলেই বয়োবৃদ্ধ ইতালির ভবিষ্যৎ রক্ষা করা সম্ভব।
ইতালির জনসংখ্যার ২৪.৩ শতাংশ প্রবীণ; তরুণ কমছে, আর বিদেশি শিশুদের ৪৩.৭ শতাংশ চরম দারিদ্র্যে। গবেষণায় অভিবাসীদের অন্তর্ভুক্তি ও প্রজন্মগত সংহতিকে জনমিতিক সংকট মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
vaticannews


