বাংলাদেশ দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার যৌথ মানবিক উদ্যোগে মিসরাতা থেকে বিশেষ ফ্লাইটে তাঁদের প্রত্যাবাসন করা হচ্ছে; এই বহরে রয়েছেন ১৮ জন শারীরিকভাবে অসুস্থ নাগরিকও।
উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ায় চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটানো আরও ১৭২ জন বাংলাদেশি নাগরিককে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাস এবং জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) যৌথ মানবিক সহায়তায় সফলভাবে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বিশেষ ব্যবস্থায় লিবিয়ার মিসরাতা শহর থেকে যাত্রা শুরু করা এই অভিবাসীদের বহনকারী ফ্লাইটটি ২৯ অক্টোবর সকাল আনুমানিক ৬টায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি বিমান সংস্থা বুরাক এয়ারের ‘ইউজেড ২২২’ (UZ222) নম্বর বিশেষ ফ্লাইটে করে তাঁদের দেশে পাঠানো হয়। বিদেশে দীর্ঘদিন মানবেতর জীবনযাপন ও নানামুখী বিপদের মুখে পড়ার পর তাঁরা নিজেদের ইচ্ছাতেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। দেশে ফেরা এই অভিবাসীদের মধ্যে অন্তত ১৮ জন মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিন পর সব ধরনের ঝুঁকি এড়িয়ে নিজ জন্মভূমিতে আপনজনদের কাছে নিরাপদে ফিরতে পারায় যাত্রীদের মধ্যে গভীর স্বস্তি দেখা গেছে।
প্রত্যাবাসন কার্যক্রম চূড়ান্ত করার আগে মিসরাতা শহরে অবস্থানরত এই বাংলাদেশিদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল মো. হাবীব উল্লাহ। যাত্রার প্রাক্কালে আয়োজিত এক প্রস্তুতিমূলক সভায় (প্রি-ডিপার্চার ব্রিফিং) তিনি অভিবাসীদের সার্বিক খোঁজখবর নেন এবং অনিয়মিত অভিবাসনের মারাত্মক ক্ষতিকর দিকগুলো বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, অবৈধ পথে বিদেশ পাড়ি দেওয়া কেবল একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ই ডেকে আনে না, বরং পুরো পরিবার ও সমাজকে মারাত্মক আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির মুখে ফেলে দেয়। দূতাবাস সবসময় প্রবাসী নাগরিকদের যেকোনো সংকটে পাশে থাকতে নিরলস কাজ করছে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।

রাষ্ট্রদূত প্রত্যাবাসিত নাগরিকদের অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও হতাশা ভুলে পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে দেশে নতুন জীবন শুরু করার পরামর্শ দেন। ভবিষ্যতে কেউ আবার জীবিকার তাগিদে প্রবাসে যেতে চাইলে কোনো অবস্থাতেই অবৈধ বা ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে না নিয়ে নির্ধারিত সরকারি নিয়ম মেনে বৈধ পথে গমনের জোরালো আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী এবং দালাল চক্রের চটকদার প্রলোভন ও প্রতারণা সম্পর্কে সমাজে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির ওপর জোর দেন রাষ্ট্রদূত। তিনি আরও বলেন, এই অসাধু মানবপাচার চক্রকে আইনের আওতায় আনতে ভুক্তভোগীদের অবশ্যই সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে নিজ এলাকার আর কাউকে এমন চরম দুর্ভোগের শিকার হতে না হয়।
এদিকে জীবননাশের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা থেকে উদ্ধার করে নিরাপদে দেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করে দেওয়ায় ত্রিপলীর বাংলাদেশ দূতাবাস এবং আইওএমের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ফিরে আসা প্রবাসীরা। দেশে ফিরে নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা, সততার সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ জীবিকা নির্বাহ করা এবং পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তাঁরা। উল্লেখ্য, লিবিয়ার বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়া কিংবা ডিটেনশন সেন্টারে বন্দী থাকা বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশিদের শনাক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনতে দূতাবাসের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বেনগাজীর গানফুদা ও ত্রিপলীর তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে আটক অন্য বাংলাদেশিদের দ্রুততম সময়ে মুক্ত করে দেশে ফেরাতে লিবিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইওএমের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ও নিবিড় সমন্বয় বজায় রাখা হচ্ছে।
লিবিয়ার মিসরাতা থেকে দূতাবাস ও আইওএমের সহযোগিতায় ১৭২ বাংলাদেশির মানবিক প্রত্যাবাসন হয়েছে; তাঁদের মধ্যে ১৮ জন অসুস্থ। ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে স্বেচ্ছায় ফেরা নাগরিকদের ভবিষ্যতে বৈধ পথে বিদেশযাত্রার আহ্বান জানানো হয়েছে।
Embassy of Bangladesh in Libya


