চলতি বছর সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরে রেকর্ডসংখ্যক সশস্ত্র হামলার প্রমাণ দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জার্মানিকে লিবিয়ার কোস্টগার্ডের সঙ্গে বিতর্কিত অংশীদারিত্ব পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী সংস্থাটি।
ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান জলপথ সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশী এবং বেসামরিক উদ্ধারকারী জাহাজগুলোর ওপর সহিংসতা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মানবিক উদ্ধারকারী সংস্থা সি-ওয়াচ (Sea-Watch)-এর প্রকাশিত এক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি বছর সাগরে নিরস্ত্র অভিবাসী ও উদ্ধারকারী কর্মীদের ওপর অন্তত ২৬টি গুরুতর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যা তাদের রেকর্ড সংরক্ষণের শুরু থেকে এ যাবৎকালের মধ্যে এক বছরে সর্বোচ্চ।
‘অ্যাক্টস অব ভায়োলেন্স বাই দ্য সো-কল্ড লিবিয়ান কোস্ট গার্ড অ্যান্ড আদার লিবিয়ান মিলিশিয়াস অ্যাট সি’ শীর্ষক প্রতিবেদনটির তথ্যমতে, ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে মোট ১০৭টি সশস্ত্র বাধার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশেরও বেশি—অর্থাৎ অন্তত ৮০টি ঘটনার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তাপুষ্ট লিবীয় কোস্টগার্ড সরাসরি জড়িত। এসব ঘটনায় সাগরে বিপন্ন নৌকার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, অভিবাসীদের মারধর, ঝুঁকিপূর্ণ মহড়ার মাধ্যমে নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং উদ্ধারকারী জাহাজগুলোকে অস্ত্র প্রদর্শন করে এলাকা ত্যাগে বাধ্য করার প্রমাণ মিলেছে। এমনকি চলতি বছরেই অন্তত পাঁচটি ঘটনায় গভীর সমুদ্রে মানুষকে জোরপূর্বক নৌকা থেকে পানিতে ফেলে দেওয়ার মতো নৃশংস আচরণ নথিভুক্ত হয়েছে।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, প্রতিবেদনে কেবল প্রমাণিত ঘটনাগুলোই এসেছে, যার বাইরে বহু সহিংসতা অগোচরেই থেকে যায়। সাগর থেকে জোরপূর্বক ফিরিয়ে নেওয়া অভিবাসীদের মৌলিক মানবাধিকার চরমভাবে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৬৯ হাজারের বেশি মানুষকে সাগর থেকে আটক করে লিবিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে কেবল গত বছরই ফেরত পাঠানো হয় ২৭ হাজারেরও বেশি মানুষকে। ২০১১ সালে সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকে বিভক্ত লিবিয়ায় সশস্ত্র মিলিশিয়া এবং অপরাধী চক্রগুলোর একচ্ছত্র প্রভাব রয়েছে। ফলে সাগর থেকে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিরা দেশটির বিভিন্ন বন্দিশালায় নিয়ে অকথ্য নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায় ও পাশবিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।

এমন সংকটময় সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ নৌ-মিশন ‘ইরিনি’ (EUNAVFOR MED IRINI)-এর মাধ্যমে লিবীয় কোস্টগার্ডকে পুনরায় সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টি জার্মানির পার্লামেন্টে আলোচনার টেবিলে রয়েছে। পাশাপাশি জেনারেল খলিফা হাফতারের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেনগাজিতেও একটি সামুদ্রিক উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্র (MRCC) গড়ে তুলতে অর্থায়ন করেছে ইইউ। ইউরোপীয় কমিশন দাবি করছে, আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনে সমুদ্রে উদ্ধার তৎপরতা বাড়ানো ও পাচারকারী নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতেই লিবীয় কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা একে সাগরে বেআইনি পুশব্যাকের সহযোগী হিসেবে দেখছেন। সি-ওয়াচের অ্যাডভোকেসি কর্মকর্তা বেরেনিস গোদিন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, যারা সাগরে মানুষের ওপর গুলি চালায় এবং লাশ ফেলে রেখে যায়, ইউরোপ তাদেরই অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
বিপজ্জনক এই সমুদ্রপথে নিয়মিত ট্র্যাজেডির তীব্রতা তুলে ধরে আইওএম জানিয়েছে, চলতি বছর সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরে অন্তত ১ হাজার ৩৬ জন অভিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন; বিগত বছরে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৩০। বিপুল ঝুঁকি ও প্রাণহানির আশঙ্কা সত্ত্বেও যুদ্ধ ও দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে বহু মানুষ এখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভূমধ্যসাগরে ২০২৬ সালে অভিবাসী ও উদ্ধারকর্মীদের ওপর লিবীয় কোস্টগার্ডের ২৬টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে সি-ওয়াচ, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
infomigrants


