ইতালিতে পৌঁছানোর অদম্য আশায় দালালদের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড় হতে গিয়ে লিবিয়ার বন্দিশিবিরে ঠাঁই হয়েছিল মশিউর ও সোহেলের; আইওএম-এর সহায়তায় স্বদেশে ফিরে তারা শোনালেন সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা।
ইউরোপের উন্নত জীবনের স্বপ্ন তাড়া করতে গিয়ে জীবনের সব উপার্জন ও সঞ্চয় হারিয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরেছেন মাদারীপুরের দুই যুবক মশিউর রহমান ও সোহেল মিয়া। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) বিশেষ বিমানে লিবিয়ার ত্রিপলির বিতর্কিত তাজুরা বন্দিশিবির থেকে উদ্ধার করা ১৭৪ জন বাংলাদেশির সঙ্গে সম্প্রতি ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তারা। বিদেশের মাটিতে টানা দেড় মাসের বেশি সময় ভাত না পেয়ে চরম নির্যাতন ও বন্দিদশায় দিন কাটানো এই দুই প্রবাসীর গল্প ইউরোপযাত্রার পেছনের এক ভয়াবহ নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে।
৩৮ বছর বয়সী মশিউর রহমানের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ দুধখালী গ্রামে। দেশে তাঁর একটি সফল খাবারের হোটেল ব্যবসা থাকলেও পাঁচ বছর ধরে ইতালিতে থাকা ছোট ভাইয়ের পথ ধরে ইউরোপে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগে। পরিবারের অমতে গত বছরের ডিসেম্বরে বাড়ি ছাড়েন তিনি। মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, কুয়েত ও মিসর হয়ে ৯ মাসের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় তিনি লিবিয়ার উপকূলীয় শহর আল-খমসে পৌঁছান। সেখানে দালালদের হুমকি ও নির্যাতনের ভয়ে পরিবার আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ধাপে ধাপে ৩২ লাখ টাকা তুলে দেয়। তবে কাঠের নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার মাত্র আধা ঘণ্টার মাথায় লিবিয়ান সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন মশিউর। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে, যেখানে ২০০ জনের ধারণক্ষমতার কক্ষে ৫০০ জন মানুষকে গাদাগাদি করে রাখা হতো। সেখানে ৪৫ দিনের বন্দিজীবনে নাইজেরীয় প্রহরীদের পাইপের পিটুনি, লোনা পানি পান করা এবং দিনে মাত্র এক বাটি রুটি ও পাস্তা খেয়ে দিন পার করতে হয়েছে তাঁকে।

অন্যদিকে একই জেলার রাজৈর উপজেলার টেকেরহাটের ৩৬ বছর বয়সী সোহেল মিয়ার গল্পটিও প্রায় একই রকম। দেশে অটোরিকশা চালিয়ে জীবনধারণ করা সোহেল ইতালি যাওয়ার আশায় পৈতৃক জমি বিক্রি করে এবং ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দালালদের ধাপে ধাপে ৩৯ লাখ টাকা দেন। মিসর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছে ফাইবার বোটে সমুদ্রে ভাসার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আটক হন তিনিও। মানব পাচারকারীদের হাতে পুনরায় বিক্রি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সোহেল ও তাঁর সঙ্গীরা সেনাসদস্যদের কাছে কাকুতি-মিনতি করে তাজুরা বন্দিশিবিরে পাঠানোর আকুতি জানান, যাতে আইওএম-এর মাধ্যমে দেশে ফেরার সুযোগ মেলে। সেখানে চরম ভিড়, অসহ্য গরম আর অনাহারের মধ্যে জীবনের এক বিবর্ণ ঈদ কাটান তিনি। ৪৮ দিনের বন্দিদশা শেষে দেশে ফেরা সোহেল জানান, আর কখনো তিনি বিদেশে পা বাড়াবেন না; দেশে একটি অটোরিকশা চালিয়ে দেনা শোধ করতে চান।
আইওএম-এর দেওয়া নীল ব্যাগ হাতে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে বাসে ওঠার সময়ও দালালদের প্রতিশোধ ও টাকা উদ্ধারের শঙ্কায় নিজেদের ছবি প্রকাশ না করার আকুতি জানান তারা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে এবং আইওএম তাঁদের পুনর্বাসনে সহায়তার কথা জানিয়েছে। তবু ঋণের ভারী বোঝা মাথায় নিয়ে গ্রামে ফেরা এই প্রবাসীরা সতর্ক করেছেন অন্য যুবকদের—ইতালির মোহে পড়ে দালালদের এই মরণফাঁদে যেন আর কেউ পা না দেন।
লিবিয়ার বন্দিশিবিরে ৪৫ দিন নির্যাতন ও অনাহারের পর ১৭৪ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন; মশিউর ও সোহেলের অভিজ্ঞতা দেখায় ইউরোপে যাওয়ার নামে দালালচক্রের ফাঁদে পড়ে পরিবারগুলো ঋণগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
prothomalo


