ইতালিতে ডিপথেরিয়া আতঙ্ক: পাদোভায় বাংলাদেশি যুবক সংকটাপন্ন, সিসিলিতে শিশুর মৃত্যুতে তোলপাড়

4 Min Read

পাদোভায় ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন এক বাংলাদেশি তরুণের সংস্পর্শে আসা ১০০ জনকে প্রতিরোধমূলক ওষুধ দেওয়া হয়েছে; অন্যদিকে সিসিলিতে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অভিভাবকদের বিরুদ্ধে মামলা ও স্কুল পর্যায়ে টিকাদান কঠোর করার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।

মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি ডিপথেরিয়ার (Diphtheria) প্রাদুর্ভাব ঘিরে ইতালি জুড়ে চরম স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় শহর পাদোভার একটি হাসপাতালে ২২ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি যুবক ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সম্ভাব্য সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে তার কর্মক্ষেত্র ও বাসস্থানের প্রায় একশত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে জরুরি প্রতিরোধমূলক অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপির আওতায় আনা হয়েছে। একই সময়ে দক্ষিণাঞ্চলীয় সিসিলিতে চার বছর বয়সী এক কন্যাশিশু এই রোগে মারা যাওয়ার পর দেশটিতে জনস্বাস্থ্য ও টিকাদান ব্যবস্থার ওপর নতুন করে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

পাদোভা ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের (Azienda Ospedale Università di Padova) সংক্রামক ব্যাধি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ভর্তি হওয়া ওই বাংলাদেশি তরুণকে বর্তমানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। রোগীর শরীরে ডিপথেরিয়ার মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার আগেই চিকিৎসকরা পাভিয়ার বিষ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (Centro Antiveleni di Pavia) থেকে বিশেষ অ্যান্টি-টক্সিন সিরাম সংগ্রহ করে দ্রুত তার দেহে প্রয়োগ করেন। পরবর্তীতে মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে এই সংক্রমণের সত্যতা মেলে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রুখতে স্থানীয় স্বাস্থ্য সংস্থা ‘উলস ৬ ইউগানিয়া’র (Ulss 6 Euganea) জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি বিভাগ (SISP) তাৎক্ষণিকভাবে রোগতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালায়। এতে যুবকের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা এবং কর্মক্ষেত্রে তার সঙ্গে কাজ করা মোট ১০০ জনকে চিহ্নিত করা হয় এবং সবাইকে এক সপ্তাহের জন্য প্রতিরোধমূলক অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সম্প্রতি সিসিলির পালেরমো শহরের ‘জেন’ (ZEN) এলাকায় আনা রোসা বার্তোলোত্তা নামের চার বছর বয়সী এক শিশুর ডিপথেরিয়ায় মৃত্যুর ঘটনা পুরো ইতালিকে নাড়া দিয়েছে। জানা গেছে, শিশুটি কোনো টিকা গ্রহণ করেনি। এমনকি তার পরিবারের অপর এক শিশুর শরীরেও এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটায় স্কুলে স্কুলে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে দায়িত্বে অবহেলাজনিত মৃত্যুর (Omicidio colposo) অভিযোগে শিশুটির বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে বিচার বিভাগ। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ দায়েরের পর ময়নাতদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নিজস্ব বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি নিয়োগের আবেদন করায় প্রক্রিয়াটি সাময়িকভাবে বিলম্বিত হয়েছে।

শিশুর মৃত্যুর পর সিসিলিতে অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দেয়। এর প্রভাবে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে শিশুদের সাধারণ টিকা নেওয়ার হার ৭০ শতাংশ এবং একদিনের ব্যবধানে বুস্টার ডোজ গ্রহণের হার ২১১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সিসিলির স্থানীয় প্রশাসন ঘোষণা করেছে, স্কুলে ভর্তির আবেদন করার পর যেসব পরিবার নির্ধারিত সময়ে টিকা গ্রহণে গড়িমসি করে, তাদের ওপর কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি চালানো হবে। বাধ্যতামূলক টিকাদানের শর্ত কঠোরভাবে কার্যকর না করলে স্কুলগুলোতে মারাত্মক স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, ‘করিনেব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরি’ নামের ব্যাকটেরিয়া শ্বাসনালীতে ঘন সাদা পর্দা তৈরি করে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করে দেয় এবং এর বিষাক্ত টক্সিন হার্ট, স্নায়ু ও কিডনি বিকল করে প্রাণহানি ঘটাতে পারে। তবে এটি ছয়টি রোগের সমন্বিত হেক্সাভ্যালেন্ট টিকার (Vaccino esavalente) মাধ্যমে পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। বিশ্বখ্যাত ওষুধ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর সিলভিও গ্যারাত্তিনি সতর্ক করে জানিয়েছেন, দেশটিতে হার্ড ইমিউনিটি বা সামগ্রিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা অপরিহার্য। বিশেষ করে ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে টিকাদানের হার কম হওয়ায় সেখানে ব্যাপক প্রচার ও নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। এই প্রেক্ষাপটে ইতালিপ্রবাসী বাংলাদেশি পরিবার ও কমিউনিটির সদস্যদের নিজেদের ও সন্তানদের স্বাস্থ্যসুরক্ষায় নিয়মিত চিকিৎসাসেবা গ্রহণ এবং বাধ্যতামূলক টিকা দ্রুত সম্পন্ন করার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

পাদুয়ায় ২২ বছর বয়সী বাংলাদেশি যুবক গুরুতর ডিফথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন; সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা ১০০ জনকে এক সপ্তাহের প্রতিরোধমূলক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে।

rainews

Share This Article