ইতালির বিখ্যাত ওয়াইন অঞ্চলে অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর চরম শোষণ: কাজ করিয়ে মজুরি ফাঁকি, নদীর তীরে মানবেতর জীবন

4 Min Read

আলবার আঙুর বাগানে দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনির পরও পারিশ্রমিক না দিয়ে উধাও মধ্যস্বত্বভোগীরা; আইন প্রণয়নের এক দশক পরও ইতালির কৃষিখাতে প্রায় দেড় লাখ কর্মী শোষণের শিকার বলে জানিয়েছে ইস্তাত।

ইতালির বিশ্বখ্যাত ওয়াইন উৎপাদনকারী অঞ্চল ল্যাঙ্গের (Langhe) প্রাণকেন্দ্র আলবা শহরে আঙুর সংগ্রহের মৌসুমে অভিবাসী কৃষি শ্রমিকদের ওপর নির্মম শ্রম শোষণের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। কাজের বৈধ চুক্তির মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে টানা দুই মাস বিরতিহীনভাবে দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করিয়ে নেওয়ার পর পারিশ্রমিক না দিয়েই উধাও হয়ে গেছে মধ্যস্বত্বভোগী দালাল বা স্থানীয়ভাবে ‘কাপোরালে’ (Caporale) নামে পরিচিত অবৈধ সিন্ডিকেট। পরিশ্রমের ন্যায্য অর্থ না পেয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া এসব অভিবাসী কর্মীরা বর্তমানে শহরের কেন্দ্রস্থলের অদূরে তানারো নদীর তীরে অস্থায়ী তাঁবু খাটিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।

ভুক্তভোগীদের একজন মামাদু (ছদ্মনাম)। নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে কাজে যুক্ত হওয়ার সময় তাকে চুক্তিপত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা ছিল শুধুই কথার কথা। বৃষ্টির দিন ছাড়া বাকি দিনগুলোতে কোনো ধরনের বিরতি ছাড়াই তাঁকে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়েছে। অথচ মৌসুম শেষে সেই মধ্যস্বত্বভোগী ব্যক্তি সম্পূর্ণ লাপাত্তা হয়ে যাওয়ায় নিজের উপার্জিত অর্থের একটি অংশও তিনি পাননি। একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি-বিসাউ থেকে আসা কার্লোস নামের আরেক অভিবাসী। তার নিয়োগকারীও কোনো অর্থ পরিশোধ না করে আত্মগোপনে চলে গেছে।

আঙুর সংগ্রহের মূল মৌসুম শেষ হলেও বাগানের অন্যান্য পরিচর্যা কাজের জন্য এখনো অনেক শ্রমিক ওই এলাকায় অবস্থান করছেন। তবে পারিশ্রমিকবঞ্চিত এসব মৌসুমি শ্রমিকদের থাকার কোনো স্থায়ী জায়গা না থাকায় তানারো নদীর পাড়ে খোলা আকাশের নিচে পলিথিন ও তাঁবু টানিয়ে রাত কাটাতে হচ্ছে। সম্প্রতি আলবা এলাকায় কৃষিখাতে পরিচালিত এক বিশেষ যৌথ তদন্তে দেখা গেছে, পরিদর্শন করা ৬৭টি ওয়াইন উৎপাদনকারী ও সংশ্লিষ্ট কৃষি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ প্রতিষ্ঠানেই গুরুতর অনিয়ম ও শ্রম আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল নামমাত্র কাজের চুক্তিপত্র থাকলেই শোষণ বন্ধ হচ্ছে না; বাস্তবে নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত কাজ করানো, চুক্তির চেয়ে কম মজুরি দেওয়া কিংবা সম্পূর্ণ মজুরি আত্মসাৎ করার প্রবণতা নিয়মিত দেখা যাচ্ছে।

অসহায় ও গৃহহীন হয়ে পড়া এসব শ্রমিকদের জরুরি খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করছে স্থানীয় ক্যাথলিক দাতব্য সংস্থা ‘কারিতাস’ (Caritas)। তবে এই অমানবিক শোষণ ও অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগী প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছেন সংস্থাটির স্থানীয় পরিচালক পাদ্রি ডন ডমিনিকো, যিনি সবার কাছে ‘ডন দোদো’ নামে পরিচিত। তাকে উদ্দেশ্য করে ক্ষুব্ধ মহল থেকে বার্তা পাঠানো হয়েছে যেন তিনি এসব বিষয়ে কথা বলা বন্ধ করেন, কারণ তাদের দাবি অনুযায়ী তথাকথিত এই শোষণ নাকি আদৌ ঘটেনি। তবে কোনো ধরনের হুমকিতে পিছু হটতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ডন দোদো। তিনি আলবার ঐতিহ্যবাহী উন্মুক্ত ওয়াইন প্রদর্শনী ‘ভিনাম’ (Vinum)-কে কেন্দ্র করে ‘নো কান্দিদুম, নো ভিনাম’ (No Candidum, no Vinum) শিরোনামে একটি বয়কট আন্দোলনের ডাক দিয়ে বলেছেন, যে প্রতিষ্ঠান শ্রমিকের অধিকার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষা করে না, তাদের এই মর্যাদাপূর্ণ আয়োজনে অংশ নিতে দেওয়া উচিত নয়।

ইতালিতে কৃষিখাতে অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট বা ‘কাপোরালাতো’ প্রথা বন্ধে কঠোর আইন কার্যকর হওয়ার ১০ বছর পার হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র এখনও উদ্বেগজনক। ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইস্তাতের (Istat) সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশটির কৃষিখাতে নিয়োজিত মোট জনবলের অন্তত ৩৪ শতাংশই এখনো অনিয়মিত এবং কোনো না কোনোভাবে শোষণের কবলে রয়েছে। বর্তমানে পুরো দেশে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার কৃষি শ্রমিক এই আধুনিক দাসত্বের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন। আইনি জটিলতা এবং কাজের অনুমোদনের সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে বিদেশি শ্রমিকদের এভাবে ব্যবহার করায় দেশটির সার্বিক শ্রম ব্যবস্থাপনা এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে।


ইতালির কৃষিখাতে ক্যাপোরালাতো-বিরোধী আইন কার্যকরের দশ বছর পরও প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার শ্রমিক শোষিত; মোট শ্রমিকের ৩৪ শতাংশের কর্মসংস্থান এখনও অনিয়মিত, যা শ্রমিক সুরক্ষার বড় চ্যালেঞ্জ ও নজরদারির দুর্বলতা।

Tg3

Share This Article