ইতালির অর্থনীতিতে অভিবাসীদের বিপুল অবদান, তবু কাটেনি কর্মক্ষেত্র ও আয়ের বৈষম্য: কারিতাস প্রতিবেদন

4 Min Read

দেশটিতে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ লাখে; জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলা ও জিডিপিতে প্রায় ১০ শতাংশ জোগান দিলেও স্থানীয়দের তুলনায় অভিবাসীদের বার্ষিক আয় গড়ে ১০ হাজার ইউরো কম।

ইতালির জাতীয় অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোতে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদান এখন অনস্বীকার্য হলেও কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি ও জীবনযাত্রার মানে তারা এখনো গভীর বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। ক্যাথলিক দাতব্য সংস্থা কারিতাস ইতালিয়া (Caritas Italiana) এবং মিগ্রান্তেস ফাউন্ডেশনের (Fondazione Migrantes) যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ৩৫তম অভিবাসন প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। গত ১৯ অক্টোবর রোমের পন্তিফিসিয়া উরবানিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ৩৬০ পৃষ্ঠার এই বার্ষিক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। মানুয়েলা দে মার্কো ও সিমোনে ভারিস্কোর সম্পাদনায় মোট ৩২ জন গবেষক ভৌগোলিক সীমান্ত ও সামাজিক সুযোগের নানামুখী ব্যবধান বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেন।

প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ইতালিতে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ লাখে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। বিগত এক বছরে দেশটিতে অভিবাসীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার, যা স্থানীয় জন্মহার হ্রাস এবং ক্রমহ্রাসমান কর্মক্ষম জনসংখ্যার ঘাটতি পূরণে সরাসরি ভূমিকা রাখছে। জাতীয় অর্থনীতিতেও তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালে ইতালিতে কর্মরত প্রায় ২৬ লাখ বিদেশি কর্মী মোট ১৯৬ বিলিয়ন ইউরো মূল্য সংযোজন (Value added) করেছেন, যা দেশটির সামগ্রিক জিডিপির ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এর পাশাপাশি বিদেশি শ্রমিকেরা বছরজুড়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ব্যক্তিগত আয়কর (IRPEF) বাবদ ১২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো জমা দিয়েছেন।

তবে অর্থনীতিতে এই বলিষ্ঠ ভূমিকা সত্ত্বেও অভিবাসীদের জীবনে সুযোগের সমতা নিশ্চিত হয়নি। তথ্যে দেখা যায়, একজন বিদেশি করদাতার গড় বার্ষিক আয় প্রায় ১৭ হাজার ইউরো, যেখানে ইতালীয় বংশোদ্ভূতদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২৭ হাজার ইউরো। পেশাগত মর্যাদার দিক থেকেও বড় ব্যবধান রয়ে গেছে; ইতালীয় কর্মীদের মাত্র ৮ শতাংশ স্বল্প মজুরি ও অদক্ষ পেশায় কাজ করলেও অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই হার ২৯ শতাংশ। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার যথাযথ স্বীকৃতি না মেলায় অনেকেই বাধ্য হয়ে নিচু স্তরের পেশায় যুক্ত থাকছেন। আর্থিক টানাটানির কারণে অভিবাসী পরিবারগুলোর আয়ের ৬০ শতাংশই চলে যায় বাসস্থান ও খাবারের মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে। তাঁদের সঞ্চয়ের হার মাত্র ১৩ শতাংশ, আর পরিবারের বাজেট থেকে ১৭ শতাংশ অর্থ নিজ নিজ দেশের স্বজনদের কাছে রেমিট্যান্স হিসেবে পাঠানো হয়।

প্রতিবেদনে অভিবাসী পরিবারের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অভিবাসী পরিবারের তরুণদের প্রায় ৩০ শতাংশই কোনো ধরনের পড়াশোনা বা কাজের সঙ্গে যুক্ত নন (NEET), যেখানে স্থানীয় তরুণদের মধ্যে এই হার ১৭ শতাংশ। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকা এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিও অভিবাসী সন্তানদের মধ্যে বেশি। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সংকট আরও তীব্র; সেখানে গির্জাকেন্দ্রিক সহায়তা নেওয়া অভিবাসীদের ৬১ দশমিক ৫ শতাংশই কর্মসংস্থানহীনতায় ভুগছেন, যা অন্যান্য অঞ্চলের (৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ) তুলনায় অনেক বেশি।

তবে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অভিবাসীদের মধ্যে ইতালিতে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা দেখা গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশ অভিবাসী জানিয়েছেন, সামাজিক সম্পর্ক ও সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশের কারণে তাঁরা ইতালিতেই থেকে যেতে চান। এ প্রেক্ষাপটে কারিতাস ও মিগ্রান্তেস নিয়মিত অভিবাসনের প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও শোষণ দূর করা এবং দীর্ঘমেয়াদে বসবাসকারীদের সুরক্ষায় ‘সামাজিক শিকড়ভিত্তিক রেসিডেন্স পারমিট’ (Permesso di soggiorno per radicamento sociale) চালুর দাবি জানিয়েছে। সংস্থা দুটির মতে, বার্ধক্যের মুখে থাকা ইতালির উচিত অভিবাসনকে কেবল সীমান্ত সংকট হিসেবে না দেখে সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করা।

ইতালিতে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ৫৬ লাখ; ২০২৫ সালে তারা ১৯৬ বিলিয়ন ইউরো মূল্য সংযোজন করলেও আয়, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুযোগে বৈষম্য রয়ে গেছে।

stranieriinitalia

Share This Article