ইতালিতে আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশিদের অভুক্ত রেখে নির্যাতন: অভ্যর্থনা কেন্দ্রের পরিচালকের ৫ বছরের কারাদণ্ড

4 Min Read

ভেরোনায় খাবার-পানি ও গ্যাস-বিদ্যুৎ বন্ধ করে শারীরিক নিপীড়নের দায়ে মাউরো মেনিনকে কারাদণ্ডসহ ভুক্তভোগী দুই বাংলাদেশিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত; বিচারকে মানবাধিকারের বড় জয় বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় ভেরোনা শহরে আশ্রয়প্রার্থী অভিবাসীদের চরম মানবেতর পরিস্থিতিতে আটকে রাখা, খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ বন্ধ করা এবং শারীরিক নির্যাতনের দায়ে একটি বেসরকারি অভ্যর্থনা কেন্দ্রের পরিচালক মাউরো মেনিনকে (৬৪) পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। ভুক্তভোগীদের মধ্যে আটজন বাংলাদেশি এবং আটজন পাকিস্তানি নাগরিক রয়েছেন। ভেরোনা আদালতের বিচারক পাওলা ভাক্কা এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে মামলার অন্যতম বাদী দুই বাংলাদেশি তরুণ সৌরভ ইসলাম ও শওকত হোসেনকে জনপ্রতি ৫ হাজার ইউরো এবং আইনি সহায়তাকারী স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা ‘ওসেরভাতোরিও মিগ্রান্তেস’কে ২ হাজার ইউরো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালতের নথি ও মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় চার মাস আলবারেদো এলাকার দুটি ফ্ল্যাটে ১৬ জন আশ্রয়প্রার্থীকে জিম্মি দশায় রাখা হয়। সেখানে তাঁদের নামমাত্র সেদ্ধ ভাত খেতে দেওয়া হতো এবং পুরো সপ্তাহের জন্য যে সামান্য খাবার বরাদ্দ থাকত, তা কয়েক দিনেই ফুরিয়ে যেত। ভুক্তভোগীরা খাদ্যের দাবিতে প্রতিবাদ জানালে অভিযুক্ত মেনিন ক্ষিপ্ত হয়ে ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সুপেয় পানির সরবরাহ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেন। এ ছাড়া মাত্র দুজনের থাকার উপযোগী একটি ছোট ফ্ল্যাটে গাদাগাদি করে আটজনকে রাখা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।

এই ভয়াবহ নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রথম মুখ খোলেন ২৪ বছর বয়সী বাংলাদেশি তরুণ সৌরভ ইসলাম। ২০২৩ সালে ইতালিতে পৌঁছানো সৌরভ বর্তমানে ভেরোনার পেসকিয়েরা এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় প্রধান পরিবেশক (কাপোসাল) হিসেবে কর্মরত। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তিনি গুগল ট্রান্সলেটের সাহায্যে ইতালীয় ভাষায় হাতে একটি চিঠি লিখে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানান। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, উন্নত ভবিষ্যৎ ও আশ্রয়ের আশায় তাঁরা ইতালিতে এলেও কেন্দ্রের পরিচালক তাঁদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালাচ্ছেন। মদ্যপ অবস্থায় নিয়মিত চড়-থাপ্পড় ও ধাক্কাধাক্কি করা, বাইরে বের হতে না দেওয়া এবং ইতালীয় ভাষা শিক্ষার কোনো সুযোগ না দিয়ে তাঁদের মৌলিক অধিকার হরণ করা হচ্ছিল।

অভিযোগের ভিত্তিতে উপ-প্রসিকিউটর সিলভিয়া ফ্যাচিওত্তির তত্ত্বাবধানে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তে বেরিয়ে আসে, কোনো অভিবাসী প্রতিবাদ জানালে বা বাইরে গিয়ে খাবার কেনার চেষ্টা করলে মেনিন তাঁদের রেসিডেন্স পারমিট (পেরমেসো দি সোজ্জোর্নো) আবেদন আটকে দেওয়া এবং আরও খারাপ পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিতেন। এমনকি দীর্ঘ সময়েও তাঁদের বিছানার চাদর বা মৌলিক গৃহস্থালি সামগ্রী পরিবর্তন করা হতো না। পরবর্তীতে মানবাধিকার সংস্থা ‘ওসেরভাতোরিও মিগ্রান্তেস’-এর সহায়তায় আইনজীবী সারা বার্বেসির মাধ্যমে সৌরভ ইসলাম ও ২৩ বছর বয়সী আরেক বাংলাদেশি শওকত হোসেন আদালতের দ্বারস্থ হন।

মামলার পটভূমিতে জানা যায়, অভিযুক্ত মেনিন অতীতে তাঁর ফ্ল্যাট দুটি ‘ভিরতুস ভেকম্প’ নামক একটি সমবায় সংস্থাকে ভাড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রিফেকচারের দেওয়া অভিবাসী তহবিল তছরুপের অভিযোগে ওই সংস্থার প্রধানের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হলে মেনিন নিজেই ‘আসোসিয়েৎসিওনে উমানিতারিয়া সোচিয়ালে’ নামে একটি সংগঠন খুলে সরাসরি অভিবাসীদের তদারকি শুরু করেন এবং এ অপরাধে জড়ান। রায়ের পর স্বস্তি প্রকাশ করে সৌরভ ইসলাম জানান, তিনি ন্যায়বিচার পেয়েছেন এবং শিগগিরই রেসিডেন্স পারমিট হাতে পেলে লেকের পাড়ে নিজের একটি বাড়ি কিনে পরিবারকে ইতালিতে নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখছেন। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনটির সভাপতি দানিয়েলে তোদেসকো রায়টিকে অভিবাসী সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্তমূলক বিজয় বলে অভিহিত করেছেন।

আলবেরেদোর অভ্যর্থনা কেন্দ্রে অভিবাসীদের খাবার, পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস থেকে বঞ্চিত ও নির্যাতনের অভিযোগে পরিচালক মাউরো মেনিনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

corrieredelveneto.corriere

Share This Article