ইতালিতে মাকে বাঁচাতে কিশোরী মেয়ের ১১২ নম্বরে ফোন: দীর্ঘ নির্যাতনের দায়ে প্রবাসী বাংলাদেশি বহিষ্কৃত

4 Min Read

জেনোভার সেস্ত্রি পোনেন্তে এলাকার একটি শিপইয়ার্ডে কর্মরত ৪৪ বছর বয়সী ব্যক্তির বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির আদালত।

ইতালির বন্দরনগরী জেনোভার সেস্ত্রি পোনেন্তে এলাকায় নিজ পরিবারে দীর্ঘদিনের সহিংসতা ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে ৪৪ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি শ্রমিককে তাঁর পারিবারিক বাসস্থান থেকে জরুরি ভিত্তিতে বহিষ্কার (Allontanamento d’urgenza) করা হয়েছে। নিজের মাকে বাবার মারমুখী আক্রমণ থেকে বাঁচাতে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরী মেয়ে দেশটির জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ১১২-এ ফোন করে সাহায্য চাইলে চরম অমানবিক এই পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে।

পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গতকাল পারিবারিক বিরোধের একপর্যায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁর স্ত্রীর দিকে ঘরের মেঝে পরিষ্কারের ঝাঁটা নিয়ে মারমুখী ভঙ্গিতে তেড়ে যান এবং প্রচণ্ড মারধরের হুমকি দেন। বাবার এমন ভয়ংকর রূপ দেখে ১৭ বছর বয়সী কিশোরী মেয়েটি তাৎক্ষণিকভাবে নিজের মাকে বাঁচাতে টেনে নিয়ে একটি শোবার ঘরে প্রবেশ করে এবং ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়। চরম আতঙ্কের মধ্যেও মেয়েটি উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে অবরুদ্ধ কক্ষের ভেতর থেকেই সরাসরি ১১২ নম্বরে কল করে পুলিশকে বিষয়টি জানায় এবং অবিলম্বে হস্তক্ষেপের অনুরোধ করে।

খবর পেয়ে স্থানীয় ক্যারাবিনিয়ারি (ইতালির জাতীয় সামরিক পুলিশ বাহিনী) দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে অবরুদ্ধ মা ও মেয়েকে উদ্ধার করে। পরবর্তীতে পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে ওই কিশোরী জানায়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; তাঁর মা বছরের পর বছর ধরে বাবার হাতে নির্মম শারীরিক নির্যাতন ও চরম মানসিক লাঞ্ছনার শিকার হয়ে আসছেন। মেয়েটি আরও অভিযোগ করে, তাঁর বাবা মাকে কখনোই ঘরের বাইরে যেতে দিতেন না এবং দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে কার্যত গৃহবন্দী করে রেখেছিলেন।

অভিযোগের বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করলে ভুক্তভোগী মা একজন দোভাষীর সহায়তায় তাঁর ওপর চলা ধারাবাহিক নির্যাতনের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। ওই নারী জানান, স্বামীর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও গৃহবন্দী জীবনের কারণে দীর্ঘ বছর দেশটিতে বসবাস করা সত্ত্বেও তিনি স্থানীয় ইতালীয় ভাষা শেখার কোনো সুযোগ পাননি। এ ছাড়া অভিযুক্তের ২২ বছর বয়সী বড় ছেলেও পুলিশের কাছে বাবার নিষ্ঠুর আচরণের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেন। উল্লেখ্য, ওই তরুণ তাঁর বাবার সঙ্গেই সেস্ত্রি পোনেন্তের একই জাহাজ নির্মাণ কারখানায় (শিপইয়ার্ড) কর্মরত রয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের বয়ান ও প্রত্যক্ষ প্রমাণের ভিত্তিতে জেনোভা আদালতের সরকারি কৌঁসুলি বা পাবলিক প্রসিকিউটর (PM) ফেদেরিকো পানিচি অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। তিনি অভিযুক্তকে অবিলম্বে তাঁর পারিবারিক বাসস্থান ছেড়ে চলে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করেন, যাতে তিনি কোনোভাবেই স্ত্রী ও সন্তানদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারেন। একই সঙ্গে ইতালীয় দণ্ডবিধির আওতায় ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা ও ধারাবাহিক অত্যাচারের (Maltrattamenti in famiglia) অভিযোগে একটি আনুষ্ঠানিক মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

ইতালীয় আইনে পারিবারিক নির্যাতন ও নারীর মৌলিক স্বাধীনতা খর্ব করা অত্যন্ত গুরুতর এবং অজামিনযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয় প্রবাসীদের মতে, রক্ষণশীল মানসিকতার জেরে নারীদের গৃহবন্দী রাখা ও ভাষা শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার মতো ঘটনা বিদেশে বসবাসকারী অনেক পরিবারের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে নতুন প্রজন্মের সন্তানদের সচেতন ভূমিকা এবং সরাসরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি প্রবাসে নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে এক দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

১৭ বছরের মেয়ের ১১২-এ ফোনের পর দীর্ঘদিন মাকে নির্যাতনের অভিযোগে ৪৪ বছর বয়সী বাবাকে গ্রেপ্তার করে পরিবারের কাছ থেকে জরুরি ভিত্তিতে দূরে সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ।

ansa

Share This Article