ক্যালাব্রিয়া ও পিডমন্ট অঞ্চলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই গবেষণায় বাংলাদেশিদের ইতালিতে পৌঁছানোর পথে এবং পরবর্তী সময়ে শোষণের শিকার হওয়ার ভয়াবহ চিত্র ও সুরক্ষার উপায় উঠে এসেছে।
ইতালিতে পাড়ি জমানো বাংলাদেশি অভিবাসীদের জীবনের ঝুঁকি, আইনি অনিশ্চয়তা এবং পাচারের শিকার হওয়ার প্রেক্ষাপট নিয়ে ‘সুরক্ষা’ (Surokkha) শিরোনামে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আইআরইএস পিডমন্ট (IRES Piemonte) কর্তৃক প্রকাশিত এই গবেষণায় ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে অভিবাসীদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও বর্তমান পরিস্থিতির বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়েছে।
এই গবেষণাপত্রটি মূলত ইতালির দুটি প্রভাবশালী পাচার বিরোধী সংস্থার যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। এর একটি হলো পিডমন্ট ও ভাল্লে ডি আওস্তা অঞ্চলের পাচার বিরোধী নেটওয়ার্ক ‘ল’আনেলো ফর্তে’ (L’Anello Forte) এবং অন্যটি হলো ক্যালাব্রিয়া অঞ্চলের ‘ইন.সি.আই.পি.আই.টি’ (In.C.I.P.I.T.)। এই সংস্থা দুটি দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, সুরক্ষা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকরণ নিয়ে কাজ করে আসছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশ থেকে ইতালি আসার পথটি অত্যন্ত জটিল এবং এই পুরো যাত্রাপথে অভিবাসীরা সামাজিক ও আইনিভাবে চরম ঝুঁকির মুখে থাকেন। প্রতিবেদন অনুসারে, দেশ ছাড়ার মুহূর্ত থেকে শুরু করে বিভিন্ন ট্রানজিট রুট এবং সবশেষে ইতালিতে পৌঁছানোর পর পর্যন্ত অভিবাসীরা এক অবিচ্ছিন্ন শোষণের চক্রে আটকা পড়েন। এই গবেষণার জন্য পাচার বিরোধী বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি এই বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষাত্কার গ্রহণ করা হয়েছে, যা প্রতিবেদনটিকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে।

প্রতিবেদনটির অন্যতম মূল বিষয় হলো ইতালির দুটি ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলের তুলনামূলক চিত্র। ক্যালাব্রিয়া (Calabria) অঞ্চলকে বাংলাদেশিদের প্রাথমিক আগমনের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এটি এমন একটি স্থান যেখানে অভিবাসীদের পাচারকারীদের হাত থেকে দ্রুত উদ্ধার করার এবং প্রাথমিক প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় সুযোগ থাকে। অন্যদিকে, উত্তর ইতালির পিডমন্ট (Piedmont) অঞ্চলে এসে এই শোষণের রূপ ভিন্ন হয়। সেখানে অভিবাসীরা বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী শ্রম শোষণের শিকার হন। এই দুই অঞ্চলের গতিরূপ বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন কীভাবে শোষণের শিকড় ইতালির অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ছে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন রোজানা লিওত্তি, ফাবিও সালিচেতি, চিয়ারা চিরিল্লো এবং লরা রুগেরো। তাদের বিশ্লেষণে ইতালিতে প্রবেশের আইনি পথগুলোর সীমাবদ্ধতা এবং তীব্র সংকটগুলোও বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন ‘অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তি’ (Patto Migrazione e Asilo) বাস্তবায়ন হওয়ার ফলে ভবিষ্যতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে, তার একটি আগাম পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
গবেষণাটির একটি বড় সাফল্য হলো, এটি কেবল সমস্যা চিহ্নিত করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং মাঠপর্যায়ে কর্মরত সামাজিক কর্মীদের জন্য কিছু কার্যকরী কৌশল বা ‘ইন্ডিকেটর’ প্রদান করেছে। এর মাধ্যমে শোষণের শিকার বাংলাদেশি অভিবাসীদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং তাদের আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করা সহজ হবে।
সামগ্রিকভাবে, ‘সুরক্ষা’ গবেষণাটি ইতালিতে বসবাসরত এবং নতুন আসা বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশিদের অভিবাসন প্রক্রিয়াকে নিরাপদ করতে হলে কেবল ইতালির অভ্যন্তরীণ আইন নয়, বরং তাদের আদি দেশ থেকে শুরু করে পুরো যাত্রাপথকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন। অভিবাসীদের এই প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য কমাতে এই গবেষণাটি নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৩–২০২৬ সালের নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যালাব্রিয়া থেকে পিডমন্ট পর্যন্ত বাংলাদেশি অভিবাসীরা পুরো যাত্রাপথজুড়ে সামাজিক ও আইনি অনিশ্চয়তা, মানবপাচার এবং শ্রম শোষণের ধারাবাহিক ঝুঁকির মুখে থাকেন।
IRES Piemonte প্রকাশিত গবেষণা “Surokkha (সুরক্ষা): Le esperienze migratorie dal Bangladesh all’Italia” (২০২৩–২০২৬)।


