স্ত্রীকে হারিয়ে তীব্র বিষণ্ণতায় ভোগা ৮৪ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের ডাকে সাড়া দিয়ে তোরিনোর পুলিশ কর্মকর্তারা মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় শহর তোরিনোর (Torino) একাকীত্বের অন্ধকারে ডুবে থাকা এক বৃদ্ধের আর্তিতে সাড়া দিয়ে মানবিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করেছে স্থানীয় পুলিশ। সাধারণত জরুরি সেবা নম্বর ১১২-তে মানুষ চুরি, ডাকাতি বা কোনো বড় দুর্ঘটনার খবর দিতে ফোন করে থাকে। কিন্তু গত শনিবার তোরিনোর সান্তা রিতা (Santa Rita) এলাকার এক বৃদ্ধের ফোনটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। কোনো অপরাধের অভিযোগ নয়, বরং তীব্র একাকীত্ব থেকে বাঁচতে কথা বলার একজন মানুষ খুঁজছিলেন তিনি।
ইতালীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৮৪ বছর বয়সী ওই বৃদ্ধ সম্প্রতি তার স্ত্রীকে হারিয়েছেন। জীবনসঙ্গিনীর চলে যাওয়ার পর থেকে তিনি নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। তার বাসায় কথা বলার মতো কেউ ছিল না এবং একাকীত্বের সেই অসহ্য মুহূর্তগুলো কাটাতে না পেরে তিনি শেষ পর্যন্ত পুলিশের সাহায্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১১২ অপারেটরকে তিনি অত্যন্ত বিনীতভাবে বলেন, “আমার কোনো বিপদ হয়নি, কিন্তু আমি খুব একা অনুভব করছি। আমার স্ত্রীর মৃত্যুর পর আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। আপনারা কি কাউকে পাঠাতে পারেন যার সাথে আমি একটু কথা বলতে পারব?”
জরুরি সেবার অপারেটররা বিষয়টিকে অবহেলা না করে তৎক্ষণাৎ তোরিনো রাজ্য পুলিশের (Polizia di Stato) একটি টহল দলকে ওই বৃদ্ধের ঠিকানায় পাঠান। সাধারণত অপরাধী ধরা বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যস্ত থাকা দুই পুলিশ কর্মকর্তা যখন বৃদ্ধের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছান, তখন তারা দেখেন সেখানে কোনো জরুরি নিরাপত্তা সংকটের চিহ্ন নেই। পরিবর্তে সেখানে ছিল একজন শোকার্ত মানুষের হৃদয়ের হাহাকার। পুলিশ সদস্যরা কেবল তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য সেখানে যাননি, বরং সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

বৃদ্ধের বাড়িতে গিয়ে তারা কেবল কয়েক মিনিট থেকে চলে আসেননি। পুলিশ কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় ওই বৃদ্ধের সাথে বসে গল্প করেন। বৃদ্ধ তাদের কফি পান করতে দেন এবং নিজের জীবনের অনেক পুরনো স্মৃতি, বিশেষ করে তার স্ত্রীর সাথে কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলোর গল্প শোনেন। পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে আশ্বস্ত করেন যে, যেকোনো প্রয়োজনে তারা সবসময় পাশে আছেন। কেবল কথা বলার মাধ্যমে যে একজন মানুষের বড় ধরনের মানসিক সংকট দূর করা সম্ভব, এই ঘটনাটি তারই প্রমাণ।
তোরিনো পুলিশের এই মানবিক আচরণের খবরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আবেগ ও প্রশংসা সৃষ্টি করেছে। ইতালির মতো উন্নত দেশে যেখানে পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে প্রবীণদের একা থাকা একটি বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে, সেখানে পুলিশের এমন সামাজিক দায়িত্ববোধকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। অনেক মানবাধিকার কর্মী মনে করছেন, এই ঘটনাটি কেবল পুলিশের মানবিকতা নয়, বরং সমাজের একা থাকা বয়স্ক মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে আমাদের নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতালিতে বসবাসরত অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য এই সংবাদটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। অনেক সময় অভিবাসী পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা নতুন দেশে ভাষাগত বা সামাজিক কারণে বিচ্ছিন্ন বোধ করেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ইতালির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেবল অপরাধ দমনেই নয়, বরং নাগরিকদের মানসিক এবং সামাজিক সংকটে বড় ধরনের সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
তোরিনোর এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, উর্দিপরা কঠোর কাঠামোর ভেতরেও একটি সংবেদনশীল হৃদয় থাকে। পুলিশের এই সহমর্মিতা কেবল ওই বৃদ্ধের একাকীত্বই দূর করেনি, বরং ইতালির জননিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের এই মানবিক পদক্ষেপটি এখন পুরো ইতালিতে এক অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্ত্রীকে হারিয়ে একাকীত্বে ভোগা তুরিনের এক বৃদ্ধ ১১২ নম্বরে ফোন করলে পুলিশ তার বাড়িতে গিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা সময় কাটিয়ে মানসিক সান্ত্বনা ও মানবিক সহায়তা দেয়।
torino.corriere


