ইতালির সিরিয়েতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর ওপর কিশোর গ্যাংয়ের বর্বরোচিত হামলা: বর্ণবাদী বিদ্বেষের অভিযোগ

4 Min Read

তুরিন প্রদেশের সিরিয়েতে এক বাংলাদেশি দোকানদারকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছে একদল ইতালীয় যুবক। দীর্ঘদিন ধরে চলা বর্ণবাদী হেনস্তার পর এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় তুরিন প্রদেশের সিরিয়ে (Cirié) শহরে এক বাংলাদেশি প্রবাসীকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে জখম করার খবর পাওয়া গেছে। শহরের ব্যস্ততম সড়ক ভিয়া রেমমার্ট-এ (Via Remmert) গত বৃহস্পতিবার এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে। আক্রান্ত ব্যক্তি একজন বাংলাদেশি নাগরিক, যিনি সেখানে একটি ছোট ব্যবসা পরিচালনা করেন। এই হামলার ঘটনায় স্থানীয় প্রবাসী ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, একদল উগ্র ইতালীয় যুবক ওই ব্যবসায়ীর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। অত্যন্ত হিংস্রভাবে চালানো এই হামলায় ভুক্তভোগী প্রবাসী গুরুতর শারীরিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। চিকিৎসকের রিপোর্ট অনুযায়ী, হামলাকারীদের লাথি ও ঘুষিতে তার নাকের হাড় এবং গালের হাড় (Zygomatic bone) ভেঙে গেছে। বর্তমানে তিনি স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলাকারীরা সংখ্যায় বেশ কয়েকজন ছিল এবং তারা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই আক্রমণটি চালায়।

ঘটনার পর ভুক্তভোগীর এক সহকর্মী সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, এটি কোনো আকস্মিক ঝগড়া বা সাধারণ বিবাদ ছিল না। তার ভাষ্যমতে, “আমরা বেশ কিছুদিন ধরেই এই কিশোর গ্যাংটির লক্ষ্যবস্তু ছিলাম। তারা প্রায়ই আমাদের দোকানে এসে অকারণে হেনস্তা করত এবং অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ বর্ণবাদী গালিগালাজ করত। গত রোববারের ঘটনাটি ছিল সেই দীর্ঘদিনের উসকানি ও বিদ্বেষেরই এক চরম বহিঃপ্রকাশ।” এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ওপর বিদেশি বিদ্বেষ বা জেনোফোবিয়া (Xenophobia) থেকেই এই হিংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।

শহরজুড়ে আলোচিত এই ঘটনাটির তদন্তভার গ্রহণ করেছে ইতালীয় পুলিশ বাহিনী কারাবিনিয়েরি (Carabinieri)। তদন্তের স্বার্থে তারা বর্তমানে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করছে। তবে স্থানীয়দের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে যে, এই ‘বেবি গ্যাং’ বা কিশোর অপরাধীদের নেপথ্যে কিছু বিপথগামী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির উসকানি থাকতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, এই উশৃঙ্খল কিশোররা মূলত অন্যদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, গত বছরের ঠিক এই জুলাই মাসেই একই সড়কে একটি ট্রান্সফোবিক (লিঙ্গ-পরিচয়জনিত বিদ্বেষ) হামলার ঘটনা ঘটেছিল, যা নিয়ে সেই সময় ইতালিতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ধারণা করা হচ্ছে, সেই একই গোষ্ঠী বা একই মতাদর্শের কিশোররাই বর্তমান হামলার সাথে জড়িত।

ইতালির মতো উন্নত রাষ্ট্রে একজন শান্তিকামী ব্যবসায়ীর ওপর এমন পৈশাচিক হামলা দেশটির সামাজিক নিরাপত্তার জন্য এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে অভিবাসী বাংলাদেশি যারা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করছেন, তাদের জন্য এই ধরণের ‘ব্রাঙ্কো’ (Branco) বা সংঘবদ্ধ দলের আক্রমণ বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের শনাক্ত করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।

সিরিয়ে শহরের এই সামাজিক ক্ষত নিরাময় এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ইতালীয় প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। কারাবিনিয়েরির পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনের পর দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, শহরের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হবে যাতে ভবিষ্যতে এমন বর্ণবাদী হামলার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

ইতালির সিরিয়ে শহরে এক বাংলাদেশি দোকানদারকে সংঘবদ্ধ হামলায় গুরুতর আহত করা হয়েছে; দীর্ঘদিনের হয়রানি ও বর্ণবাদী বিদ্বেষের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে কারাবিনিয়েরি ঘটনার তদন্ত চালাচ্ছে।

ilrisveglio

TAGGED:
Share This Article