অনিয়মিত অভিবাসনবিরোধী অভিযান: লিবিয়া থেকে ১৮৪ বাংলাদেশিসহ ৫৮২ জন প্রত্যাবাসিত

4 Min Read

পূর্ব লিবিয়ার বেনগাজি থেকে গত ২৪ ঘণ্টার এক বিশেষ অভিযানে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ৫৮২ জন অনিয়মিত অভিবাসীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর সহযোগিতায় এই বিশাল প্রত্যাবাসন কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।

বেনগাজি, লিবিয়া:

লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেনগাজি থেকে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ৫৮২ জন অনিয়মিত অভিবাসীকে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। গত ১৫ জুলাই লিবিয়ার ডিরেক্টরেট ফর কমব্যাটিং ইলিগ্যাল মাইগ্রেশন (ডিসিআইএম) এক ফেসবুক বিবৃতিতে এই গণ-প্রত্যাবাসনের তথ্য নিশ্চিত করেছে। উত্তর আফ্রিকার এই দেশটিতে অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে চলমান কড়াকড়ি এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার অভিযানের অংশ হিসেবে গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই বিশাল সংখ্যক মানুষকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ফেরত পাঠানো এই অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশ, সুদান, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, পাকিস্তান ও ইয়েমেনের নাগরিকরা রয়েছেন। লিবিয়া থেকে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার উদ্দেশ্যে আসা এসব অভিবাসী দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতা ও বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে আটকে ছিলেন।

বিমানযোগে প্রত্যাবাসনের বিস্তারিত

ডিসিআইএম-এর তথ্য অনুযায়ী, বেনগাজির বেনিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পরিচালিত একাধিক বিশেষ ফ্লাইটের মাধ্যমে আকাশপথে অভিবাসীদের পাঠানো হয়েছে। প্রথম দফায় একটি ফ্লাইটে ১২ জন বাংলাদেশি, ২১ জন সুদানি এবং ১ জন পাকিস্তানি নাগরিককে তাদের দেশের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে আরও একটি বিশেষ ফ্লাইটে ১৭২ জন বাংলাদেশি এবং ২ জন ইয়েমেনি নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে একদিনের ব্যবধানে মোট ১৮৪ জন বাংলাদেশি নাগরিককে লিবিয়া থেকে প্রত্যাবাসন করা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি আইনি পথ অনুসরণ করে এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) সাথে সমন্বয় করে সম্পন্ন করা হয়েছে।

স্থলপথে অভিবাসী স্থানান্তর

বিমানবন্দরের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন ছাড়াও লিবীয় কর্তৃপক্ষ স্থলপথেও বড় একটি দল স্থানান্তর করেছে। ডিসিআইএম-এর বেনগাজি শাখা জানিয়েছে, অন্তত ৩৭৪ জন সোমালি ও ইথিওপীয় অভিবাসীকে স্থলপথে বারকা বিচে অবস্থিত একটি কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে পরবর্তী ধাপে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে। মূলত যারা সীমান্ত পার হয়ে অবৈধভাবে লিবিয়ায় প্রবেশ করেছিল, তাদের শনাক্ত করে এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছে।

প্রত্যাবাসন কেন্দ্রের পরিবেশ

প্রত্যাবাসনের ঠিক আগ মুহূর্তে বেনগাজির একটি কেন্দ্রে অভিবাসীদের বৈচিত্র্যময় চিত্র দেখা গেছে। প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যে জানা গেছে, দীর্ঘ অপেক্ষার পর দেশে ফেরার আগে অনেক অভিবাসীকে নামাজ আদায় করতে দেখা গেছে। কেউ কেউ ক্লান্ত শরীরে অপেক্ষা করছিলেন আবার অনেক অভিবাসী নারী তাদের কোলের সন্তানের যত্ন নিচ্ছিলেন। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কায় থাকা এসব মানুষের চোখেমুখে এক ধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে। তবে দীর্ঘ কারাবাস বা সেন্টারের জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে নিজ দেশে ফেরার সুযোগ পাওয়া অনেকের জন্য ছিল স্বস্তির।

তথ্যের অস্পষ্টতা ও নিরাপত্তা প্রশ্ন

লিবিয়া কর্তৃপক্ষ এই বিশাল প্রত্যাবাসন কার্যক্রমকে একটি সফল অভিযান হিসেবে দাবি করলেও এর পেছনের কিছু বিষয় নিয়ে অস্পষ্টতা থেকে গেছে। ডিসিআইএম তাদের বিবৃতিতে এই অভিবাসীদের আইনি অবস্থান বা তারা ঠিক কতদিন ধরে আটক ছিলেন, সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রদান করেনি। এমনকি এই বিশাল সংখ্যক মানুষের প্রত্যাবাসন কি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় হয়েছে নাকি তাদের বাধ্যতামূলকভাবে পাঠানো হয়েছে, সে বিষয়েও লিবীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি। এছাড়া স্বাধীন কোনো সূত্র থেকে লিবিয়ার দেওয়া এই সংখ্যা ও তথ্যের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

লিবিয়া বর্তমানে মানবপাচার এবং অনিয়মিত অভিবাসনের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি রক্ষায় দেশটির কর্তৃপক্ষ প্রায়শই এ ধরণের গণ-প্রত্যাবাসন অভিযান পরিচালনা করে থাকে। বাংলাদেশের অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও এই প্রক্রিয়া নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রতি বছর শত শত বাংলাদেশি নাগরিক লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাওয়ার পথে আটক হয়ে পুনরায় দেশে ফিরে আসছেন।

লিবিয়ার বেনগাজি থেকে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশিসহ ৫৮২ অনিয়মিত অভিবাসীকে আইনগত প্রক্রিয়ায় নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে; এর মধ্যে ১৮৪ জন ছিলেন বাংলাদেশি।

infomigrants

TAGGED:
Share This Article