লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় সরকারের নতুন অভিবাসন নীতি: ১ লাখ ১৭ হাজার অভিবাসীকে বহিষ্কার

4 Min Read

লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বেনগাজি ভিত্তিক প্রশাসন সে দেশে অবস্থানরত অনিয়মিত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করেছে। নতুন এক অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে, তারা ইতোমধ্যে ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৫০ জন বিভিন্ন জাতীয়তার অভিবাসীকে দেশ থেকে বহিষ্কার করেছে। একইসঙ্গে বাস্তুচ্যুত সুদানি নাগরিকদের জন্য একটি বিশাল ‘স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন’ কর্মসূচি পরিচালনার দাবিও করেছে তারা।

লিবিয়ার নতুন কঠোর অভিবাসন আইন

গত ২৭ জুলাই লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী ওসামা হামাদ (Osama Hammad) অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিকদের আগমন পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠক শেষে সরকারের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, গত জুন মাসে জারি করা ‘প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নং ১১৩/২০২৪’-এর অধীনে এই বহিষ্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নতুন এই ডিক্রি অনুযায়ী সুদান, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া এবং সোমালিয়ার নাগরিকদের জন্য লিবিয়ার স্থল, জল ও আকাশপথের সব সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে এই চার দেশের কূটনৈতিক ও কনস্যুলার কর্মীদের পাশাপাশি শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতের অনুমোদিত পেশাজীবীদের এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী ওসামা হামাদ জোর দিয়ে বলেছেন যে, সরকার অনিয়মিত অভিবাসনকে একটি ‘সার্বভৌম ইস্যু’ হিসেবে দেখছে, যা লিবিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। সিদ্ধান্তটির ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে বৈধ রেসিডেন্সি পারমিট বা বসবাসের অনুমতি নেই এমন সুদান, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া এবং সোমালিয়ার নাগরিকদের অবিলম্বে বহিষ্কার করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

সুদানি নাগরিকদের স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন ও বৈপরীত্য

বেনগাজি প্রশাসন আরও দাবি করেছে যে, অন্তত ১ লাখ সুদানি নাগরিক বর্তমানে স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফেরার জন্য নিবন্ধন করেছেন এবং তাদের জন্য বিশেষ মানবিক ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে জাতিসংঘের পরিসংখ্যান লিবিয়ার এই দাবির সাথে কিছুটা অমিল প্রকাশ করছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর (UNHCR)-এর মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, সারা লিবিয়ায় নিবন্ধিত সুদানি নাগরিকের সংখ্যা ৯৪ হাজারেরও কম, যেখানে পুরো দেশে মোট নিবন্ধিত শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার।

লিবিয়ার টবরুক (Tobruk) শহরে অবস্থানরত সুদানিদের জন্য একটি ‘জাতীয় স্বাস্থ্য শংসাপত্র কর্মসূচি’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই কর্মসূচির অধীনে স্বাস্থ্য কার্ড সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক, যার চড়া ব্যয় বহন করতে অনেক শরণার্থী হিমশিম খাচ্ছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই অর্থনৈতিক চাপ ও বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষার আড়ালে অভিবাসীদের ওপর এক ধরণের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে।

বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন

সুদানি নাগরিকদের এমন এক সময়ে দেশে পাঠানো হচ্ছে যখন সুদান ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের কবলে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (RSF) মধ্যে চলমান লড়াইয়ে সুদান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম মানবিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। জাতিসংঘের মতে, সুদানে বর্তমানে চরম দুর্ভিক্ষ, পানীয় জলের অভাব এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিপর্যয় চলছে। বিশেষ করে এল ওবেইদ (El Obeid) সংলগ্ন এলাকায় অবরোধ ও ড্রোন হামলার কারণে পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এমন পরিস্থিতিতে সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন সম্ভব কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পটভূমি ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকেই লিবিয়া কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। ত্রিপোলি ভিত্তিক জাতিসংঘ স্বীকৃত সরকার এবং বেনগাজি ভিত্তিক ফিল্ড মার্শাল খলিফা হাফতারের অনুসারী প্রশাসনের এই বিভক্তি লিবিয়াকে মানবপাচারকারী ও মিলিশিয়াদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। আফ্রিকা থেকে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টাকারী অভিবাসীরা লিবিয়ায় এসে প্রায়ই অপহরণ, মুক্তিপণ এবং শোষণের শিকার হন।

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সম্প্রতি এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, সুদান ও ইরানে চলমান সংকটের কারণে ২০১৫ সালের অভিবাসন সংকটের মতো আবারও বিপুল সংখ্যক মানুষ ইউরোপ অভিমুখে রওনা হতে পারে। লিবিয়ার এই আকস্মিক ও গণ-বহিষ্কার নীতি সেই সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


পূর্ব লিবিয়া ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৫০ জন অনিয়মিত অভিবাসীকে বহিষ্কারের দাবি করেছে; নতুন অভিবাসন বিধিনিষেধের মধ্যে ১ লাখের বেশি সুদানি নাগরিক স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার জন্য নিবন্ধন করেছেন।

infomigrants

TAGGED:
Share This Article