সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে পালানোর চেষ্টা করলে বা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাধা দিলে অভিবাসীদের অতিরিক্ত ১২ সপ্তাহ আটকে রাখার নতুন আইনি সংশোধনী আনছে মেলোনি সরকার।
রোম, ইতালি
ইতালিতে অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে ‘বিচার ও ইইউ প্যাক্ট’ (Giustizia e Patto Ue) সংক্রান্ত ডিক্রিতে একটি নতুন সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে, যা কার্যকর হলে সীমান্ত কেন্দ্রগুলোতে অভিবাসীদের আটকে রাখার মেয়াদ আরও তিন মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। মূলত যারা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন অথবা যাদের দেশ থেকে বহিষ্কার বা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চলাকালীন অসহযোগিতার অভিযোগ থাকে, তাদের ক্ষেত্রেই এই বর্ধিত আটকাদেশ কার্যকর হবে।
নতুন সংশোধনীর মূল বিষয়বস্তু
বর্তমানে প্রচলিত আইন অনুযায়ী অভিবাসীদের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আটক রাখা যায়। তবে নতুন এই ‘জিড়ো দি ভিতে’ বা কঠোর ব্যবস্থার আওতায় তিনটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ১২ সপ্তাহ বা অতিরিক্ত তিন মাস আটকে রাখার বিধান রাখা হয়েছে। প্রথমত, যদি কোনো অভিবাসীর পালিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি থাকে। দ্বিতীয়ত, যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রত্যাবাসন বা বহিষ্কারের আইনি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেন। এবং তৃতীয়ত, যদি পাসপোর্ট জমা রাখা, নির্দিষ্ট ঠিকানায় অবস্থান বা নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার মতো কম কঠোর বিকল্প ব্যবস্থাগুলো প্রয়োগ করা সম্ভব না হয়।
ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই আটকাদেশ বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের পুলিশ প্রধান বা ‘কোয়েস্টর’ (Questore)-এর হাতে। এর ফলে সীমান্ত কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ‘অ্যাক্সিলারেটেড বর্ডার প্রসিডিউর’ বা দ্রুততর স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সহজ হবে বলে মনে করছে সরকার। তবে আইনি এই কড়াকড়ির একটি সর্বোচ্চ সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো অভিবাসীকে আগে থেকেই আটক রাখা হয়ে থাকে, তবে নতুন মেয়াদ যোগ করার পর মোট আটকের সময়সীমা কোনোভাবেই ১৮ মাস বা দেড় বছরের বেশি হবে না।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ
সরকারের এই নতুন পদক্ষেপকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ ডানপন্থী রাজনীতির অভ্যন্তরীণ সমীকরণের অংশ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য রবার্তো ভাননাচ্চি (Vannacci) এবং তার অনুসারীদের কট্টর নিরাপত্তা ও অভিবাসন বিরোধী অবস্থানের বিপরীতে মেলোনি সরকার নিজেকে আরও শক্তিশালী প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। আগামী নির্বাচনী প্রচারণায় এই কঠোর অভিবাসন নীতিকে বড় ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে ক্ষমতাসীন জোটের।
বর্তমানে ইতালির সিনেটের বিচার ও সাংবিধানিক বিষয়ক কমিটিতে এই সংশোধনী নিয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটি চলছে। তবে এই প্রস্তাবটি নিয়ে জোট সরকারের অভ্যন্তরীণ শরিকদের মধ্যেও মতভেদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ফোরজা ইতালিয়া এবং ফ্রাতেলি দি ইতালিয়া দলের মধ্যে বিভিন্ন আইনি বিষয়ে টানাপোড়েন চলছে।

বাংলাদেশি ও বিদেশি অভিবাসীদের ওপর প্রভাব
ইতালিতে আসার পর যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই বা যারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে সীমান্তে অপেক্ষমাণ রয়েছেন, তাদের জন্য এই নতুন নিয়ম বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় ভাষাগত জটিলতা বা আইনি পরামর্শের অভাবে অভিবাসীরা ভুলবশত কর্মকর্তাদের সাথে অসহযোগিতা করে ফেলেন, যা এখন তাদের দীর্ঘ মেয়াদী আটকের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই প্রস্তাবের সমালোচনা করে বলছে যে, আটকের মেয়াদ বাড়ানো অভিবাসীদের মানবিক অধিকারকে সংকুচিত করতে পারে।
ইতালির বিভিন্ন সীমান্ত কেন্দ্রে বর্তমানে প্রচুর সংখ্যক অভিবাসী অবস্থান করছেন। গ্রীষ্মের এই সময়ে সাগরে অভিবাসীদের আগমন বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারের এই নতুন কড়াকড়ি অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা এখন দেখার বিষয়। খুব শীঘ্রই সিনেটে ভোটাভুটির পর এই নিয়মটি চূড়ান্ত আইনি রূপ পেতে পারে।
ইতালিতে সীমান্ত কেন্দ্র থেকে পালানোর চেষ্টা বা প্রত্যাবাসনে বাধা দিলে অভিবাসীদের অতিরিক্ত তিন মাস আটক রাখা যাবে। তবে মোট আটককাল কোনো অবস্থাতেই ১৮ মাসের বেশি হবে না।
ilmessaggero


