সিঁড়ির বাতি জ্বালাতে গিয়ে ভুল করে প্রতিবেশীর কলবেল টিপে দেওয়ায় এক বাংলাদেশি নারীর ঘরে তলোয়ার নিয়ে ঢুকে পড়ে অভিযুক্ত এক চীনা নাগরিক; পরবর্তীতে পুলিশি তল্লাশিতে ওই ব্যক্তির বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে অসংখ্য তলোয়ার ও খঞ্জর।
পাদোভা, ইতালি
ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় পাদোভা (Padova) শহরে একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সিঁড়ির বাতি জ্বালাতে গিয়ে ভুলবশত প্রতিবেশীর কলবেল টেপাকে কেন্দ্র করে এক প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারকে ‘কাতানা’ (জাপানি দীর্ঘ তলোয়ার) নিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ৩৯ বছর বয়সী এক চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় ওই এলাকায় বসবাসরত অভিবাসীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ ওই ব্যক্তির বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্রের একটি ছোটখাটো ভাণ্ডার উদ্ধার করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ও ভয়াবহ পরিস্থিতি
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সময় ভুক্তভোগী বাংলাদেশি নারী তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজ অ্যাপার্টমেন্টে অবস্থান করছিলেন। ওই সময় তার নাতনিরা অ্যাপার্টমেন্টের বাইরের করিডোর বা সিঁড়িঘর দিয়ে যাওয়ার সময় অন্ধকারের মধ্যে লাইট জ্বালাতে চেয়েছিল। ভুলবশত তারা বাতির সুইচের বদলে পাশের ফ্ল্যাটের কলবেলটি টিপে দেয়। এই তুচ্ছ ঘটনায় চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন প্রতিবেশী ওই চীনা নাগরিক।
অভিযুক্ত ব্যক্তি তৎক্ষণাৎ ঘর থেকে একটি ধারালো কাতানা বের করে ওই বাংলাদেশি নারীর অ্যাপার্টমেন্টে অনধিকার প্রবেশ করেন। ভুক্তভোগী নারীর ঘরের দরজা সে সময় খোলা থাকায় অভিযুক্ত ব্যক্তি সরাসরি ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং তলোয়ার উঁচিয়ে শিশুদের খুঁজতে শুরু করেন। আতঙ্কিত শিশুরা প্রাণভয়ে দৌড়ে গিয়ে একটি শোবার ঘরে আশ্রয় নেয়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে ওই বাংলাদেশি নারী দ্রুত ইতালির জরুরি পরিষেবা নম্বর ১১২ (112)-তে কল করে পুলিশের সাহায্য চান।
পুলিশি অভিযান ও অস্ত্রের ভাণ্ডার উদ্ধার
খবর পেয়ে ইতালির আধাসামরিক পুলিশ বাহিনী কারাবিনিয়েরি (Carabinieri)-র একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ কর্মকর্তাদের দেখে অভিযুক্ত ব্যক্তি কিছুটা শান্ত হন এবং তার হাতে থাকা ৪৯ সেন্টিমিটার দীর্ঘ ফিক্সড ব্লেড কাতানাটি পুলিশের হাতে তুলে দেন। তবে ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে পুলিশ ওই ব্যক্তির ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
তল্লাশি চালিয়ে স্টোর রুমের ভেতরে লুকানো অবস্থায় যা পাওয়া গেছে, তা দেখে পুলিশ কর্মকর্তারাও বিস্মিত হয়ে পড়েন। ওই ব্যক্তির বাসা থেকে আরও দুটি বড় কাতানা, পাঁচটি তলোয়ার এবং ১৯টি ধারালো খঞ্জর বা ড্যাগার উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত প্রতিটি অস্ত্রই ছিল অত্যন্ত ধারালো এবং ব্যবহারের উপযোগী খাপ বা কভারসহ রাখা।

আইনি ব্যবস্থা ও অভিযোগ
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, ৩৯ বছর বয়সী ওই চীনা নাগরিকের কাছে এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র রাখার কোনো বৈধ লাইসেন্স বা অনুমতিপত্র ছিল না। এমনকি তিনি কখনো এসব অস্ত্রের কথা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ঘোষণাও করেননি। ইতালির আইন অনুযায়ী, এ ধরনের মারাত্ম অস্ত্র ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখা বা বহন করা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
পুলিশ ইতিমধ্যে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি গুরুতর ধারায় মামলা দায়ের করেছে। তার বিরুদ্ধে অন্যের বাসগৃহে অবৈধ অনুপ্রবেশ (Violazione di domicilio), মারাত্মক অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে গুরুতর হুমকি প্রদান (Minaccia aggravata) এবং অবৈধভাবে অস্ত্র মজুত ও রাখার (Possesso e detenzione abusiva di armi) অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে পুলিশ ঘটনাটি নিয়ে আরও বিস্তারিত তদন্ত করছে যে, ওই ব্যক্তি অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত কি না।
অভিবাসী কমিউনিটিতে প্রতিক্রিয়া
পাদোভার মতো জনবহুল শহরে বাংলাদেশি ও চীনা উভয় কমিউনিটিরই বড় উপস্থিতি রয়েছে। একটি সাধারণ ভুল থেকে এমন সশস্ত্র হামলার চেষ্টা প্রবাসীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি পরিবারটি যেভাবে হামলার শিকার হতে যাচ্ছিল, তা স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় প্রশাসন সবাইকে সচেতন থাকার এবং এ ধরনের পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
ইতালির আইনি প্রক্রিয়ায় এই ঘটনার বিচার এখন আদালতে গড়াচ্ছে। অনধিকার প্রবেশ এবং মরণঘাতী অস্ত্র নিয়ে হুমকির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির কঠোর শাস্তির সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ঘরের দরজা সবসময় সুরক্ষিত রাখা এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে সরাসরি পুলিশের সাহায্য নেওয়া কতটা জরুরি।
পাদোভায় প্রতিবেশীদের কাটানা দিয়ে হুমকির অভিযোগে এক ৩৯ বছর বয়সী ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তার বাসা থেকে দুই কাটানাসহ মোট ২৬টি ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।
ansa


