ইতালির অর্থনীতিতে নতুন মডেল: দক্ষিণ ইতালি বদলে দিতে প্রফেসর ইউনূসের ‘সোশ্যাল ইনোভেশন ডিস্ট্রিক্ট’

4 Min Read

নেপলস মেয়রের সাথে ইউনূস সেন্টারের সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত; ২০২৯ সালের মধ্যে ১৪টি নতুন সামাজিক ব্যবসা এবং আন্তর্জাতিক ফান্ড গঠনের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বিশাল উদ্যোগ।

ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক চেহারা বদলে দিতে এবং সামাজিক সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধান খুঁজতে নোবেলজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের ‘সোশ্যাল বিজনেস’ বা সামাজিক ব্যবসার ধারণা এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করতে যাচ্ছে। নেপলস সিটির মেয়র এবং স্থানীয় শীর্ষস্থানীয় সামাজিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর আমন্ত্রণে সেখানে প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘মেডিটেরেনিয়ান সোশ্যাল ইনোভেশন ডিস্ট্রিক্ট’ (Mediterranean Social Innovation District)। গত ১৬ জুলাই নেপলস সফরকালে প্রফেসর ইউনূস এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে এই বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নেপলস, পালের্মো এবং পোতেনজাকে কেন্দ্র করে সামাজিক ব্যবসার একটি সমন্বিত ‘ইকোসিস্টেম’ বা পরিবেশ গড়ে তোলা। নেপলসের ঐতিহাসিক স্প্যানিশ কোয়ার্টার্সে অবস্থিত ‘ফোকাস’ (Fondazione Quartieri Spagnoli – FOQUS) সদর দপ্তরে এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রফেসর ইউনূসের উদ্ভাবিত সামাজিক ব্যবসার সাতটি নীতিমালা অনুসরণ করে একটি নতুন অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করা হবে, যা কেবল মুনাফা অর্জন নয় বরং সমাজের মৌলিক সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দেবে।

চুক্তি স্বাক্ষর পরবর্তী এক নাগরিক সমাবেশে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস তার দর্শনের মূল দিকগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, তরুণ কিংবা অভিবাসীদের কখনোই বোঝা হিসেবে দেখা উচিত নয়। তারা প্রত্যেকেই অসীম সম্ভাবনা ও সৃজনশীলতার আধার। সোশ্যাল বিজনেসের মাধ্যমে আমরা এমন একটি পথ তৈরি করতে চাই যেখানে মানুষ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেই উদ্যোক্তা হয়ে নিজের সমস্যার সমাধান করতে পারবে।” বিশেষ করে ইতালিতে থাকা অভিবাসী এবং বেকার তরুণদের জন্য এই প্রকল্প কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৭ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক তিন বছরের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নেপলস, পালের্মো এবং পোতেনজায় মোট ১৪টি নতুন সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। ইউনূস সেন্টার এই প্রকল্পের কারিগরি সহযোগী হিসেবে কাজ করবে এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কিং ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান করবে। এছাড়া তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য একটি ‘আন্তর্জাতিক সোশ্যাল বিজনেস ফান্ড’ গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে এই চুক্তিতে।

এই উদ্যোগটি প্রচলিত দাতব্য বা কল্যাণমূলক ব্যবস্থার চেয়ে আলাদা। এখানে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য এমন সব ব্যবসায়িক মডেল নকশা করা হবে যা নিজে নিজেই স্বনির্ভর হতে পারবে। প্রফেসর ইউনূস এই অঞ্চলকে “সোশ্যাল বিজনেসের ইউরোপীয় পরীক্ষাগার” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, দক্ষিণ ইতালির মতো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলো যদি এই মডেলে সফল হয়, তবে তা পুরো ইউরোপের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

বিশেষ করে ইতালিতে বসবাসরত অভিবাসীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এই ডিস্ট্রিক্ট বড় ভূমিকা রাখবে। বৈশ্বিক ইউনূস নেটওয়ার্কের সঙ্গে ইতালির এই নতুন ডিস্ট্রিক্ট যুক্ত হওয়ায় স্থানীয় উদ্ভাবনগুলো আন্তর্জাতিক পরিচিতি পাবে। এই সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষিণ ইতালি কেবল একটি শিল্প অঞ্চল নয়, বরং মানবিক অর্থনীতির একটি কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল। আগামী বছরগুলোতে এই ১৪টি নতুন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হলে স্থানীয় কমিউনিটির মালিকানাধীন উদ্যোগগুলো কীভাবে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করে, তা দেখার অপেক্ষায় আছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইউনূস সেন্টারের সহযোগিতায় দক্ষিণ ইতালিতে প্রথম ‘মেডিটেরেনিয়ান সোশ্যাল ইনোভেশন ডিস্ট্রিক্ট’ গড়ে উঠছে, যা সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

Yunus Centre

TAGGED:
Share This Article