তীব্র দাবদাহে তিউনিসিয়া উপকূলে মৃত্যুঝুঁকিতে থাকা ৩৮ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে ওশান ভাইকিং জাহাজ, তবে ইতালীয় কর্তৃপক্ষের দূরবর্তী বন্দর বরাদ্দের সিদ্ধান্তে উদ্ধারকৃতদের ভোগান্তি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ভূমধ্যসাগরের তিউনিসিয়া উপকূলীয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অঞ্চল (Search and Rescue Zone) থেকে গত শনিবার (১৮ জুলাই) ৩৮ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে মানবিক সংস্থা ‘এসওএস মেডিটেরানি’ (SOS Mediterranée) পরিচালিত জাহাজ ‘ওশান ভাইকিং’। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে একটি বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু এবং নারী, যারা অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে সাগরে ভাসছিলেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, একটি নড়বড়ে লোহার নৌকায় করে এই অভিবাসীরা ইউরোপের পথে পা বাড়িয়েছিলেন।
এসওএস মেডিটেরানি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, উদ্ধারকৃত ৩৮ জনের মধ্যে ১৪ জনই অভিভাবকহীন শিশু এবং আটজন নারী। এই নারীদের মধ্যে আবার ছয়জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। উদ্ধারকৃতদের অধিকাংশই ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া এবং সুদানের মতো সংঘাতকবলিত অঞ্চল থেকে আসা নাগরিক। উদ্ধারকারী দল যখন তাদের কাছে পৌঁছায়, তখন ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা ছিল ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রচণ্ড গরমে সবাই তীব্র পানিশূন্যতায় ভুগছিলেন এবং নৌযানটির অবস্থা ছিল জীবনহানিকর। সংস্থাটি দাবি করেছে, অত্যন্ত দ্রুততার সাথে উদ্ধার অভিযান শুরু করায় একটি বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
তবে উদ্ধার পরবর্তী প্রক্রিয়া নিয়ে ইতালীয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে এনজিওটি। ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওশান ভাইকিং জাহাজটিকে রোমের নিকটবর্তী সিভিতাভেচিয়া (Civitavecchia) বন্দরে যাত্রীদের নামানোর নির্দেশ দিয়েছে। বর্তমান অবস্থান থেকে ওই বন্দরে পৌঁছাতে জাহাজটির অন্তত তিন দিন সময় লাগবে। এনজিওগুলোর অভিযোগ, ইতালি সরকার পরিকল্পিতভাবে উদ্ধারকারী জাহাজগুলোকে মূল ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরের বন্দরে পাঠাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন অসুস্থ ও পরিশ্রান্ত অভিবাসীদের সমুদ্রে অবস্থানের সময় বাড়ছে, অন্যদিকে উদ্ধারকারী জাহাজগুলো দীর্ঘ সময় সাগরের মূল পয়েন্টে অনুপস্থিত থাকছে। এর ফলে সাগরে নতুন কোনো জরুরি অবস্থা তৈরি হলে সেখানে সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।

একদিকে যখন সাগরে মানবিক বিপর্যয় চলছে, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অভিবাসন ইস্যুটিকে দেখা হচ্ছে মূলত নিরাপত্তা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডের ইইউ প্রেসিডেন্সির অধীনে ডাবলিনে আয়োজিত এক বৈঠকে ইইউ সদস্য দেশগুলোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। বৈঠকে মানবিক সহায়তার চেয়ে অবৈধ প্রবেশ রোধ, ভিসা নীতি কঠোর করা এবং তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়ে অভিবাসীদের প্রবেশের পথ বন্ধ করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ভূমধ্যসাগরে বেসরকারি উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো তীব্র আইনি ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। সম্প্রতি ‘সি-ওয়াচ ৫’ (Sea-Watch 5) নামক একটি উদ্ধারকারী জাহাজের ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশে সহায়তার অভিযোগে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে ইতালীয় কর্তৃপক্ষ। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এ ধরনের আইনি পদক্ষেপ মূলত এনজিওগুলোর কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করার একটি কৌশল। এর পাশাপাশি সাগরে লিবীয় উপকূলরক্ষী বাহিনীর আক্রমণাত্মক আচরণও বাড়ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লিবীয় কর্তৃপক্ষ উদ্ধারকারী জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি চালানোর হুমকি দিয়েছে বলে জানা গেছে, যা এই অঞ্চলে মানবিক কার্যক্রমকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈধ পথের সীমাবদ্ধতার কারণে অভিবাসীরা ক্রমেই আরও বেশি ঝুঁকি নিতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে অভিভাবকহীন শিশুদের বড় সংখ্যাটি নির্দেশ করছে যে, সংঘাত ও দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে তারা কতটা মরিয়া। একদিকে মানবিক প্রয়োজনের বাস্তবতা আর অন্যদিকে ইউরোপের কঠোর সীমান্ত নীতি—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম এখন এক বড় রাজনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত হয়েছে। ওশান ভাইকিং এখন তিন দিনের দীর্ঘ যাত্রা শেষে সিভিতাভেচিয়া বন্দরে পৌঁছানোর অপেক্ষায় রয়েছে।
তিউনিসিয়ার উপকূলে ডুবন্ত নৌকা থেকে ৩৮ অভিবাসীকে জীবিত উদ্ধার করেছে ওশান ভাইকিং; উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ১৪ জন সঙ্গীহীন শিশু, যাদের অধিকাংশই সংঘাতকবলিত দেশ থেকে পালিয়ে এসেছে।
infomigrants


