মরক্কো সীমান্ত দিয়ে স্পেনের ছিটমহল সেউতায় অভিবাসীদের স্রোত অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় আবাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে; পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সরকারের কাছে দ্রুত ও জোরালো পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন অঞ্চলটির প্রেসিডেন্ট।
মাদ্রিদ:
মরক্কোর উত্তর উপকূলে অবস্থিত স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত ছিটমহল সেউতায় (Ceuta) বর্তমানে এক চরম সংকটকাল বিরাজ করছে। গত কয়েক সপ্তাহে এই অঞ্চলে অবৈধভাবে অভিবাসীদের প্রবেশের হার কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় জনজীবন ও প্রশাসনিক কাঠামো তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিকে ‘চরম উদ্বেগজনক’ হিসেবে বর্ণনা করে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অবিলম্বে “তৎক্ষণাৎ এবং শক্তিশালী” হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সেউতার প্রেসিডেন্ট জেসুস বিভাস (Jesus Vivas)। রক্ষণশীল দল ‘পিপলস পার্টি’র (PP) এই নেতা এক সংবাদ সম্মেলনে সতর্ক করে বলেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে রাষ্ট্রকে এখনই বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
প্রেসিডেন্ট বিভাস কর্তৃক প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুলাই মাসের শেষ দুই সপ্তাহেই প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন অভিবাসী সেউতায় প্রবেশ করেছেন। গড়ে প্রতিদিন অন্তত ২০০ জন মানুষ অনিয়মিত উপায়ে এই ছিটমহলে ঢুকছেন। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অভিবাসীদের একটি বড় অংশ পার্শ্ববর্তী মরক্কো থেকে উত্তাল সমুদ্র সাঁতরে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, এই প্রবাহ অব্যাহত থাকলে তা অচিরেই এক নিয়ন্ত্রনহীন মানবিক সংকটে রূপ নেবে।
সেউতার বর্তমান সংকটের অন্যতম সংবেদনশীল দিক হলো অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের (Unaccompanied Minors) নিরাপত্তা ও আশ্রয়। সরকারি তথ্যমতে, বর্তমানে প্রায় ৫০০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসী শিশু-কিশোর সেউতার অভ্যর্থনা কেন্দ্রগুলোতে অবস্থান করছে। জেসুস বিভাস জানিয়েছেন, এই কেন্দ্রগুলোর ধারণক্ষমতা এখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেন্দ্রগুলোতে নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১ হাজার ৬০০ শতাংশ বেশি মানুষ গাদাগাদি করে থাকছেন। প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি বর্তমান এই ধারায় অভিবাসীদের আসা অব্যাহত থাকে, তবে অচিরেই সেউতা ২০২১ সালের মে মাসের মতো একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। উল্লেখ্য, সেই সময় মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হাজার হাজার অভিবাসী সেউতায় প্রবেশ করেছিলেন, যা স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে এক চরম মানবিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল।

তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতার চেয়েও জেসুস বিভাস যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি মর্মবেদনা প্রকাশ করেছেন, তা হলো অভিবাসন প্রত্যাশীদের মৃত্যু। গত ১২ মাসের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, সমুদ্রপথে সাঁতরে স্পেনের এই ভূখণ্ডে আসার চেষ্টাকালে অন্তত ৬০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাণ হারানো এই ব্যক্তিদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। স্বপ্নের ইউরোপে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সমুদ্রে নেমে প্রাণ হারানো এই তরুণদের বিয়োগান্তক পরিণতিকে তিনি বর্তমান সময়ের “সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও নিষ্ঠুর” সত্য হিসেবে বর্ণনা করেন।
সমুদ্রপথে এই মৃত্যুর মিছিল থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক এক ঘটনার কথা উল্লেখ করে জানানো হয়, স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের মালাগা উপকূল থেকে আজই আরও তিনটি মৃতদেহ উদ্ধার করেছে সমুদ্র উদ্ধারকারী দল (Salvataggio Marittimo)। উদ্ধারকৃত এই ব্যক্তিদের পায়ে সাঁতারের বিশেষ সরঞ্জাম ‘ফিন’ (fins) পরা ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, তারাও সমুদ্রপথে দীর্ঘ দূরত্ব সাঁতরে স্পেন উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত লোনা জলের কাছে হার মানতে হয়েছে।
সেউতার স্থানীয় সরকার মনে করছে, এটি কেবল একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং এটি স্পেনের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। মরক্কোর সাথে সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা এবং অভিবাসীদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি ও জোরালো ভূমিকা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ক্রমবর্ধমান এই জনস্রোত এবং প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা মৃত্যু ঝুঁকি সামলানো সেউতা কর্তৃপক্ষের একার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই সংকট সমাধানে এখন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং তার সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক মহল।
জুলাইয়ের শেষ দুই সপ্তাহে প্রায় ১,৫০০ অভিবাসী সেউতায় প্রবেশ করেছেন; প্রায় ৫০০ অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ককে সামলাতে কেন্দ্রগুলো ধারণক্ষমতার ১,৬০০% ছাড়িয়েছে, আর গত এক বছরে সমুদ্র থেকে ৬০ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।
ansa


