ধারণক্ষমতার চেয়ে তিনগুণ বেশি বন্দি এবং তদারকি কর্মকর্তার পদ দীর্ঘ আট মাস ধরে শূন্য থাকায় লুক্কার সান জর্জিও কারাগারে সৃষ্টি হয়েছে অমানবিক পরিবেশ; চলতি বছর ইতালীয় কারাগারে এটি ৫৭তম আত্মহত্যার ঘটনা।
ইতালির তোসকানা অঞ্চলের লুক্কা শহরের সান জর্জিও (San Giorgio) কারাগারে ২৩ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি বন্দির আত্মহননের ঘটনা দেশটির বিদ্যমান কারাবন্দি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও তীব্র উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গত বুধবার সকালে কারাগারের একটি সেলের ভেতরে ওই তরুণকে ফাঁস লাগানো অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি একক মৃত্যু নয়, বরং ইতালির জরাজীর্ণ ও অতি-জনাকীর্ণ কারাগারগুলোতে বন্দিদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ চিত্র হিসেবে সামনে এসেছে।
পুলিশ ও কারাসূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মৃত যুবক চুরির অভিযোগে আটক হয়ে ওই কারাগারে বন্দি ছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, সহবন্দিদের সাথে মারমুখী ও আগ্রাসী আচরণের কারণে তাকে শেষ কয়েকদিন একটি একক সেলে (Isolation cell) আলাদাভাবে রাখা হয়েছিল। তবে এই ঘটনার পেছনে সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, আত্মহত্যার ঠিক কয়েকদিন আগে কারাকর্তৃপক্ষ ওই তরুণের একটি বিশেষ মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করেছিল। চিকিৎসকদের সেই চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ওই যুবকের মধ্যে কোনো ধরনের মানসিক ব্যাধি বা অস্বাভাবিকতা খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছিল। ফলে একজন ‘মানসিকভাবে সুস্থ’ হিসেবে চিহ্নিত তরুণ কেন এবং কীভাবে কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারির মধ্যে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন, তা নিয়ে এখন নানা মহলে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
সান জর্জিও কারাগারের বর্তমান পরিস্থিতিকে মানবাধিকার কর্মীরা ‘অমানবিক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, এই কারাগারটি মূলত মাত্র ৩৩ জন বন্দি রাখার জন্য নির্মিত হয়েছিল। অথচ বর্তমানে সেখানে ধারণক্ষমতার চেয়ে তিনগুণ বেশি অর্থাৎ প্রায় ১০০ জন বন্দিকে অত্যন্ত ঘিঞ্জি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা হচ্ছে। ইতালিতে চলমান তীব্র দাবদাহ এবং সেলের ভেতর জায়গার অভাব বন্দিদের মানসিক অস্থিরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই অমানবিক পরিস্থিতির কারণেই বন্দিদের মধ্যে ক্ষোভ ও আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই ট্র্যাজেডির পেছনে প্রশাসনিক গাফিলতির একটি বড় দিক উন্মোচিত হয়েছে। ইতালীয় আইনে বন্দিদের অধিকার রক্ষার জন্য ‘গ্যারান্টার’ (Garante dei detenuti) বা তদারকি কর্মকর্তা নিয়োগের বিধান রয়েছে। এই কর্মকর্তার প্রধান কাজ হলো কারাগারের ভেতর বন্দিরা সঠিক আইনি ও মানবিক সুবিধা পাচ্ছেন কি না তা নিশ্চিত করা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, লুক্কার এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি গত আট মাস ধরে সম্পূর্ণ শূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে তৎকালীন গ্যারান্টার গামবার্ডেল্লা (Gambardella) পদত্যাগ করার পর স্থানীয় কাউন্সিল নতুন কাউকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। ফলে কারাগারে বন্দিদের সুবিধা-অসুবিধা দেখার মতো কোনো নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষ সেখানে দীর্ঘকাল অনুপস্থিত ছিল।
এই মৃত্যুর খবরটি জানাজানি হওয়ার পর ইতালির বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক দল তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। বন্দিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রভাবশালী সংগঠন ‘অ্যান্টিগোনে’ (Antigone) এবং রাজনৈতিক দল ‘রিফন্ডাজিওনে কোমুনিস্তা’ (Rifondazione Comunista) এক যৌথ বিবৃতিতে এই অকাল মৃত্যুর জন্য কারাকর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সরাসরি দায়ী করেছে। তারা অবিলম্বে নতুন গ্যারান্টার নিয়োগ এবং বন্দিদের মানবিক অধিকার বজায় রাখতে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ইতালির কারাগারগুলোতে আত্মহত্যার মিছিল কোনোভাবেই থামছে না। ২০২৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ইতালির বিভিন্ন কারাগারে এ নিয়ে মোট ৫৭ জন বন্দি আত্মহত্যা করেছেন। এই ভয়াবহ সংখ্যাটি ইতালির বিচার বিভাগ ও কারাব্যবস্থার আমূল সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে আবারো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি বন্দিদের জন্য ভাষাগত সমস্যা, একাকীত্ব এবং আইনি সহায়তার অভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই ঘটনার পর এখন দেখার বিষয়, ইতালীয় কর্তৃপক্ষ কারাগারের এই নরকসম পরিবেশ পরিবর্তনে আদতে কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না।
লুক্কার সান জর্জিও কারাগারে ২৩ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি বন্দির মৃত্যুর ঘটনায় ইতালির সবচেয়ে জনাকীর্ণ কারাগারের সংকট আবারও সামনে এসেছে; ৩৩ জনের স্থানে প্রায় ১০০ বন্দি রয়েছেন।
corrierefiorentino.corriere


