ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন চুক্তির আওতায় নিবন্ধিত হওয়া সত্ত্বেও অন্য দেশ থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের গ্রহণে ১২টি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে ইতালি। কমিশনের প্রাথমিক মূল্যায়নে ইতালির এই অসহযোগিতাকে আইনি ও বাস্তবায়নের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ব্রাসেলস ও রোম:
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বহুল আলোচিত ‘নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তি’ (EU Pact on Migration and Asylum) আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় এর বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইতালি থেকে নিবন্ধিত হওয়া আশ্রয়প্রার্থীদের অন্য দেশ থেকে পুনরায় ইতালিতে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে রোমের অনীহা ইইউ নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে। গত ১২ জুন চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পর প্রথম তিন সপ্তাহেই ইতালি অন্তত ১২টি প্রত্যাবাসন অনুরোধ আটকে দিয়েছে বলে ইউরোপীয় কমিশনের সাম্প্রতিক তথ্যে উঠে এসেছে।
বিমানযোগে প্রত্যাবাসচুক্তির মূল উদ্দেশ্য ও বর্তমান সংকটনের বিস্তারিত
গত ১৬ জুলাই ইউরোপীয় কমিশন ইইউভুক্ত দেশগুলোর এই নতুন চুক্তির প্রয়োগ নিয়ে একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই চুক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ইতালি, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং স্পেনের মতো সীমান্ত দেশগুলোর ওপর থেকে অভিবাসনের চাপ কমানো। তবে একই সাথে নিয়ম করা হয়েছিল যে, কোনো আশ্রয়প্রার্থী প্রথম যে দেশে নিবন্ধিত হবেন, সেই দেশকেই তার আবেদনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দায়িত্ব নিতে হবে। এটি মূলত পুরনো ‘ডাবলিন রেগুলেশন’-এরই একটি আধুনিক সংস্করণ।
কমিশনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্পেন ও সাইপ্রাস এই নিয়মগুলো যথাযথভাবে মেনে চললেও ইতালি তা মানতে গড়িমসি করছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকেই ইতালি বিশেষ কিছু ক্ষেত্র (যেমন অপ্রাপ্তবয়স্কদের পারিবারিক পুনর্মিলন) ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত নেওয়া স্থগিত করে রেখেছিল। নতুন চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও ইতালির এই অবস্থানের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হওয়ায় ব্রাসেলস উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

কমিশনের কড়া বার্তা ও ইতালির প্রস্তুতি
ইউরোপীয় কমিশন তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, ইতালি নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকরের জন্য প্রশাসনিকভাবে ‘উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা’ চালিয়েছে। বিমান, সমুদ্র ও স্থলপথে অভিবাসী স্থানান্তর ইউনিট পরিচালনার জন্য তারা দীর্ঘমেয়াদী নতুন কর্মীও নিয়োগ দিয়েছে। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে এই স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি এখনো গতি পায়নি। কমিশনের রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ইতালি এখনো অন্য সদস্য দেশগুলোর সাথে প্রত্যাবাসনের লজিস্টিক ও ব্যবহারিক পদক্ষেপগুলো নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেনি।
ইইউ কর্তৃপক্ষ ইতালিকে নির্দেশ দিয়েছে যেন তারা দ্রুত এই প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করে। এর মধ্যে একটি জরুরি ডিক্রি আইন পাসের বিষয় রয়েছে, যা চুক্তির মূল ধারাগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। ইইউর আদালতও (ECJ) ইতিমধ্যে এক রায়ে জানিয়েছে যে, কোনো সদস্য দেশ একতরফাভাবে তাদের এই দায়বদ্ধতা থেকে নিজেদের মুক্ত ঘোষণা করতে পারে না
গ্রিসের অগ্রগতি ও জার্মানির চাপ
ইতালির বিপরীতে গ্রিস এই চুক্তির বাস্তবায়নে বেশ ইতিবাচক অগ্রগতি দেখিয়েছে। নতুন নিয়ম চালুর পর গ্রিসকে পাঠানো ৮টি অনুরোধের সবকটিই তারা গ্রহণ করেছে। গ্রিস ইতিমধ্যে একটি ‘নিউ ডাবলিন ইউনিট’ (New Dublin Unit) গঠন করেছে যেখানে বহু সংখ্যক স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কারিগরি দিক থেকেও গ্রিস তাদের সিস্টেমকে ইউরোপীয় ডাটাবেস বা ‘ইউরোড্যাক’ (Eurodac)-এর সাথে সফলভাবে সংযুক্ত করেছে।
অন্যদিকে, জার্মানির মতো দেশগুলো যারা অভ্যন্তরীণভাবে অনিয়মিত অভিবাসনের চাপে রয়েছে, তারা কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটছে। জার্মানি চায় অন্য দেশে আগে নিবন্ধিত হওয়া অভিবাসীদের সেই দেশেই ফেরত পাঠাতে। ইতালির অনীহার কারণে জার্মানি সাময়িকভাবে শেনজেন এলাকার ভেতরেও পাসপোর্ট তল্লাশি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করেছে, যা মূলত মুক্ত চলাচলের নীতির পরিপন্থী।
ভবিষ্যৎ পথরেখা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসন বিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার জানিয়েছেন, ইউরোপের বহিঃসীমান্ত সুরক্ষিত হলে শেনজেন এলাকার ভেতরের কড়াকড়ি ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্স (Frontex)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে ইউরোপে অনিয়মিত প্রবেশ গত বছরের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। আগামী অক্টোবর মাসে কমিশনের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতির একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্য-বিশ্লেষণ রিপোর্ট প্রকাশ করার কথা রয়েছে, যা থেকে চুক্তির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
infomigrants
নতুন ইইউ অভিবাসন চুক্তি কার্যকরের প্রথম তিন সপ্তাহেই ইতালিতে নিবন্ধিত আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত পাঠানোর ১২টি প্রচেষ্টা আটকে দিয়েছে ইতালি, যা বাস্তবায়ন নিয়ে ইইউর উদ্বেগ বাড়িয়েছে।


