নেদারল্যান্ডসের শ্রম সংকট দূর করতে ত্রাতা অভিবাসীরা: এক বছরেই নিয়োগ পেলেন ১৩ হাজারের বেশি মানুষ

4 Min Read

তীব্র কর্মী সংকট মোকাবিলায় অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর ভরসা রাখছে নেদারল্যান্ডসের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো; গত এক বছরে দেশটিতে রেকর্ড কর্মসংস্থান ও ইউজুড়ে ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।

আমস্টারডাম

ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ নেদারল্যান্ডস বর্তমানে এক নজিরবিহীন শ্রম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট কাটাতে ডাচ কোম্পানিগুলো এখন অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকছে। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত এক বছরে দেশটির বিভিন্ন বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে ১৩ হাজার ৫০০-এর বেশি আশ্রয়প্রার্থী ও বৈধভাবে বসবাসের অনুমতিপ্রাপ্ত অভিবাসী নিয়োগ পেয়েছেন। মূলত লজিস্টিকস, হসপিটালিটি, প্রযুক্তি এবং ফ্যাসিলিটি সার্ভিসের মতো জরুরি খাতগুলোতে এই নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

এই সাফল্যের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছেন ৪৬ বছর বয়সী সিরীয় অভিবাসী ইসাম। প্রায় সাত বছর আগে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে পালিয়ে নেদারল্যান্ডসে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন শরণার্থী শিবিরে কাটানোর পর আসবাবপত্র নির্মাতা জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান ‘আইকিয়া’ (IKEA)-তে সাধারণ কর্মী হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি সেখানে চারটি বিভাগের দলনেতা বা টিম লিডার হিসেবে কাজ করছেন। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইসাম বলেন, “কাজ কেবল পরিবারের ভরণপোষণ নয়, সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখে। আমি এখন অনুভব করি যে আমার প্রতিবেশীরা আমাকে শ্রদ্ধা করেন।”

নেদারল্যান্ডসে অভিবাসীদের কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রাখছে ‘টেন্ট নেদারল্যান্ডস’ (Tent Nederland) নামক একটি জোট। মার্কিন দই প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান চবানি-র (Chobani) প্রধান নির্বাহী হামদি উলুকায়ার উদ্যোগে গঠিত এই বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত রয়েছে প্রায় ৫১টি বড় ডাচ কোম্পানি। এই জোট মূলত শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের সরাসরি নিয়োগকর্তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে জব ফেয়ার বা চাকরি মেলার আয়োজন করে। জোটের পরিচালক হেলেন ভ্যান মেল জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের একটি আইনি পরিবর্তনের ফলে এখন আশ্রয়প্রার্থীরা পূর্ণকালীন কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন, যা কোম্পানিগুলোর জন্য লোকবল খুঁজে পাওয়া সহজ করে দিয়েছে।

বিশ্বখ্যাত হোটেল চেইন ‘ম্যারিয়ট’ (Marriott) এই জোটের মাধ্যমে অভিবাসীদের নিয়োগ দিতে ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে। করোনা মহামারির সময় প্রায় ৫০ জন ইউক্রেনীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার পর তাদের কাজের প্রতি নিষ্ঠা দেখে মুগ্ধ হয় কর্তৃপক্ষ। রটারডাম ম্যারিয়ট হোটেলের জেনারেল ম্যানেজার ক্লডিয়া ভ্যান ডার গ্রাফ জানান, তারা বর্তমানে সিরীয় ও ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের নিয়োগ দিচ্ছেন এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। নিয়োগকর্তাদের মতে, এই নতুন কর্মীরা অত্যন্ত অনুগত, অনুপ্রাণিত এবং কাজ শিখতে আগ্রহী।

শ্রম বাজারের এই চাহিদা মেটাতে ডাচ সরকারও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি দেশটির সরকার ঘোষণা করেছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ৭৫ হাজার ‘স্ট্যাটাস হোল্ডার’ বা বৈধ অভিবাসীকে কর্মসংস্থানে যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো, বসবাসের অনুমতি পাওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ নবাগত অভিবাসী যেন পূর্ণকালীন চাকরিতে যোগ দিতে পারেন। উল্লেখ্য যে, নেদারল্যান্ডসে বর্তমানে বেকারত্বের হার মাত্র ৩.৮ শতাংশ, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় হারের (৫.৯ শতাংশ) চেয়ে অনেক কম।

কেবল নেদারল্যান্ডসেই নয়, পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়ন জুড়েই অভিবাসীদের কর্মসংস্থানের হার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ‘রকউউল ফাউন্ডেশন বার্লিন’ (RFBerlin)-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ইইউতে অভিবাসীদের কর্মসংস্থানের হার ছিল ৬৮ শতাংশ। এর মধ্যে ইইউ বহির্ভূত নাগরিকদের কর্মসংস্থানের হার ৫৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল চাকরি পাওয়াই যথেষ্ট নয়। আরএফবার্লিনের পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান ডাস্টম্যানের মতে, বর্তমান চ্যালেঞ্জ হলো অভিবাসীদের যোগ্যতাকে সঠিক জায়গায় ব্যবহার করা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিবাসীদের উচ্চতর ডিগ্রি থাকলেও তারা সাধারণ কাজ করছেন। তাই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত সার্টিফিকেশন বা যোগ্যতার স্বীকৃতির বাধাগুলো দূর করা এবং শ্রম বাজারে অ-ইউরোপীয় নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো। নেদারল্যান্ডসের এই মডেলটি সফল হলে তা পুরো ইউরোপের শ্রম সংকট সমাধানে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।

নেদারল্যান্ডসে শ্রম সংকট মোকাবিলায় গত বছর ১৩,৫০০-এর বেশি নথিভুক্ত অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীকে নিয়োগ দিয়েছে বড় কোম্পানিগুলো, আর সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ৭৫ হাজারকে কর্মসংস্থানে আনতে চায়।

infomigrants

TAGGED:
Share This Article