দুই দশকে প্রথমবার: অস্ট্রিয়ায় নতুন আশ্রয়ের আবেদনের চেয়ে বহিষ্কারের সংখ্যা বেশি

4 Min Read

অস্ট্রিয়া সরকার দাবি করেছে যে কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং পারিবারিক পুনর্মিলন প্রক্রিয়া প্রায় বন্ধ করার ফলেই দেশটিতে অনিয়মিত অভিবাসীর সংখ্যা কমানো এবং বহিষ্কারের হার বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।

অস্ট্রিয়ার অভিবাসন ইতিহাসে এক নতুন নজির স্থাপিত হয়েছে। গত ২০ বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো দেশটিতে নতুন আশ্রয়ের আবেদনের চেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আশ্রয়ের আবেদনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং একই সময়ে রেকর্ড সংখ্যক অভিবাসীকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। দেশটির রক্ষণশীল নেতৃত্ব এই পরিসংখ্যানকে তাদের অভিবাসন নীতির বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে।

পরিসংখ্যান ও সরকারি বক্তব্য

অস্ট্রিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গেরহার্ড কার্নার (Gerhard Karner) সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে অভিবাসন সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য প্রকাশ করেন। তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে নতুন করে মাত্র ২,১০৬ জন আশ্রয়ের জন্য প্রাথমিক আবেদন করেছেন। বিপরীতে, একই সময়ে ২,২০০ জন অভিবাসীকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আশ্রয়ের আবেদনের এই হার প্রায় ৩,২০০ থেকে অনেকটা কমে এসেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কার্নার এই উন্নয়নকে দেশের সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর জন্য ‘সঠিক এবং প্রয়োজনীয়’ পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ইতালির মতো অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোও যখন অভিবাসন সংকটে হিমশিম খাচ্ছে, তখন অস্ট্রিয়ার এই অবস্থান একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করে।

আবেদনকারীদের উৎস দেশ

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আবেদনকারীদের দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে সিরিয়া ও আফগানিস্তান। মোট আবেদনের প্রায় ২৫ শতাংশই এই দুই দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে এসেছে। তালিকার পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে সোমালিয়া (৭ শতাংশ), এবং ইরান। এছাড়া তুরস্ক এবং রাশিয়া থেকে আসা আবেদনকারীদের হার যথাক্রমে ৫ শতাংশ করে।

পারিবারিক পুনর্মিলন ও মানবাধিকার বিতর্ক

অস্ট্রিয়া সরকারের অভিবাসন নীতিতে সবথেকে বড় প্রভাব পড়েছে পারিবারিক পুনর্মিলন (Family Reunification) প্রক্রিয়ায় আনা কঠোর বিধিনিষেধের ফলে। ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে প্রায় ৬,০০০ মানুষ এই প্রক্রিয়ায় অস্ট্রিয়ায় আসার সুযোগ পেলেও এ বছর সেই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫০ জনে। গত মে মাসে সরকার একটি নতুন কোটা ভিত্তিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করে, যা পরিবারের সদস্যদের আসার সংখ্যার ওপর কঠোর বার্ষিক সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো সরকারের এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছে। বিশেষ করে অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘কারিতাস ইউরোপ’ (Caritas Europa) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, পারিবারিক পুনর্মিলন কোনো বিশেষ সুযোগ নয় বরং এটি একটি মানবাধিকার। সংস্থাটির মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসী অপেক্ষারত অবস্থায় প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যান (যাকে ‘এজিং আউট’ বলা হয়), যার ফলে তারা পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার আইনি অধিকার হারিয়ে ফেলেন।

ইউরোপের বাইরে বহিষ্কার কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা

অভ্যন্তরীণ সংস্কারের পাশাপাশি অস্ট্রিয়া এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে ‘রিটার্ন হাব’ বা বহিষ্কার কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। ইতালি ও আলবেনিয়ার মধ্যকার চুক্তির আদলে অস্ট্রিয়াসহ ইইউ-এর আরও চারটি দেশ (ডেনমার্ক, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিস) এই উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। তবে কাউন্সিল অফ ইউরোপের মানবাধিকার কমিশনার মাইকেল ও’ফ্ল্যাহার্টি (Michael O’Flaherty) সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, এ ধরনের বহির্ভূত পরিকল্পনা অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

এছাড়া সিরীয় শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে জার্মানির সঙ্গেও আলোচনা শুরু করেছে অস্ট্রিয়া। যারা অস্ট্রিয়ার সমাজে ভালোভাবে মিশে গেছেন তাদের থাকার সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবা হলেও, অন্যদের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় বা জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির।

সরকারের এই কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতে ইতালিসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোর অভিবাসন নীতিতে কী প্রভাব ফেলে, তা এখন দেখার বিষয়। তবে এই মুহূর্তে অস্ট্রিয়া প্রশাসন তাদের কঠোর সীমান্ত নীতি বজায় রাখতে অনড় অবস্থানে রয়েছে।

২০ বছরের মধ্যে প্রথমবার অস্ট্রিয়ায় নতুন আশ্রয় আবেদনের চেয়ে বহিষ্কারের সংখ্যা বেশি হয়েছে; কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পুনর্মিলন সীমিত করাকে সরকার এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

infomigrants

TAGGED:
Share This Article