স্ত্রীকে অমানবিক শারীরিক নির্যাতনের দায়ে মনফালকোনের এক বাংলাদেশীকে সাড়ে তিন বছরের জেলদণ্ড শেষে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে ইতালীয় কর্তৃপক্ষ। ইতালির কঠোর পারিবারিক সুরক্ষা আইনের অধীনে ওই প্রবাসীর থাকার বৈধ অনুমতিপত্রও বাতিল করা হয়েছে।
ইতালির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মনফালকোনে (Monfalcone) বসবাসরত এক বাংলাদেশী নাগরিককে তার পরিবারের ওপর অমানবিক ও নৃশংস নির্যাতনের দায়ে স্থায়ীভাবে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ইতালীয় রাষ্ট্রীয় পুলিশ (Polizia di Stato) আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত ২৩ জুলাই তাকে বিশেষ পাহারায় বিমানে তুলে সরাসরি বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। পারিবারিক সহিংসতা ও জখমের অভিযোগে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং কারাদণ্ড ভোগের পর তার বিরুদ্ধে এই চূড়ান্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পটভূমি ও নির্যাতনের বিবরণ
আদালতের নথিপত্র এবং পুলিশি তদন্ত থেকে জানা যায়, অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি দীর্ঘকাল ধরে তার স্ত্রীর ওপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালিয়ে আসছিলেন। মনফালকোনের বাসায় স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের উপস্থিতিতেই তিনি প্রায়শই চড়, ঘুষি ও লাথি মারার মতো সহিংস কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতেন। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, নির্যাতনের শিকার নারী যখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন, সেই সংবেদনশীল সময়েও অভিযুক্ত ব্যক্তি তাকে বারবার প্রহার এবং লাঞ্ছিত করেছেন। বিচার চলাকালীন প্রমাণিত হয় যে, তিনি তার স্ত্রীকে গুরুতর শারীরিক জখম (Lesioni personali aggravate) প্রদান করেছিলেন।
বিচারিক প্রক্রিয়া ও আদালতের রায়
পারিবারিক সহিংসতা ও নির্যাতনের গুরুত্ব বিবেচনা করে গোরিৎসিয়া (Gorizia) আদালত গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে (সূত্র অনুযায়ী) তাকে তিন বছর ছয় মাস কারাদণ্ডের আদেশ দেন। পরবর্তীতে অভিযুক্ত ব্যক্তি এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলেও ত্রিয়েস্তে (Trieste) আপিল বিভাগ নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন। আদালত স্পষ্ট করে জানায় যে, পারিবারিক সহিংসতা বা ‘মালত্রাত্তামেন্তো’ (Maltrattamenti) ইতালীয় আইনে একটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ এবং এর কোনো ক্ষমা নেই।

বসবাসের অনুমতিপত্র বাতিল ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা
কারাদণ্ড ও অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে গোরিৎসিয়া পুলিশের প্রধান বা কোয়েস্টর (Questore) ওই প্রবাসীর ইতালিতে কাজ করার বৈধ অনুমতিপত্র বা ‘পারমেসো দি সোজোর্নো’ (Permesso di soggiorno per lavoro subordinato) বাতিল করার নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে তার পক্ষ থেকে করা ইইউ দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের অনুমতি বা ‘পিডিএস ইললি মিত্তাতো’ (Soggiornanti di lungo periodo)-র আবেদনটিও সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়।
পরবর্তীতে গোরিৎসিয়ার প্রিফেক্ট (Prefetto) ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বহিষ্কার আদেশ বা ‘দেক্রেতো দি এসপুলসিওনে’ (Decreto di espulsione) জারি করেন। বহিষ্কারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাকে একটি বিশেষ বহিষ্কার কেন্দ্রে (Centro di permanenza per il rimpatrio) রাখা হয়েছিল। ইতালির বিচারপতি বা ‘জিউদিচে দি পাচে’ (Giudice di pace) সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে পুলিশের এই বহিষ্কারাদেশকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেন।
ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও বর্তমান অবস্থা
পুলিশের ইমিগ্রেশন বিভাগ (Ufficio Immigrazione) শুরু থেকেই ভুক্তভোগী নারী ও তার সন্তানদের সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদারকি করেছে। নির্যাতনের শিকার নারী ও তার সন্তানদের একটি বিশেষ সুরক্ষা কেন্দ্র বা ‘সেন্ট্রো আন্তিভায়োলেনজার’ (Centro antiviolenza) অধীনে রাখা হয়েছে। সেখানে তাদের বর্তমান আবাসন, আইনি সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
কমিউনিটির জন্য বার্তা
এই ঘটনাটি ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশী প্রবাসী সমাজের জন্য একটি জোরালো সতর্কবার্তা। ইতালীয় প্রশাসন পারিবারিক সহিংসতা এবং নারী ও শিশু অধিকার রক্ষায় আপসহীন। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর ওপর নির্যাতন চালানো হলে কেবল জেলেই যেতে হয় না, বরং স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকার হারিয়ে নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার মতো কঠোর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
ilgoriziano
স্ত্রীকে গর্ভাবস্থাসহ বারবার নির্যাতনের দায়ে ৩ বছর ৬ মাসের সাজাপ্রাপ্ত এক বাংলাদেশির ইতালির বসবাসের অনুমতি বাতিল করে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে পুলিশ।


