সিউটা সীমান্তে নজিরবিহীন অভিবাসন সংকট: ১৮ মৃত্যু ও স্পেনের সেনা মোতায়েন

4 Min Read

 উত্তর আফ্রিকার স্প্যানিশ ছিটমহল সিউটাতে গত কয়েক দিনে কয়েক হাজার অভিবাসীর অবৈধ প্রবেশের চেষ্টা এবং সমুদ্রে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।

মরক্কো সীমান্ত সংলগ্ন স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সিউটাতে (Ceuta) এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনে সমুদ্রপথে সাঁতরে স্পেনে প্রবেশের চেষ্টার সময় অন্তত ১৮ জন অভিবাসীর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন এই পরিস্থিতিকে ২০২১ সালের পর সবথেকে বড় এবং নজিরবিহীন সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে প্রায় ১,৫০০ জন অভিবাসী অবৈধভাবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সিউটাতে প্রবেশ করেছেন। ছিটমহলটির প্রেসিডেন্ট হুয়ান জেসুস ভিভাস (Juan Jesus Vivas) জানিয়েছেন, গত ১০ দিনে এই প্রবেশের সংখ্যা প্রায় ২,০০০ ছাড়িয়েছে। অভিবাসীদের বড় একটি অংশ মূলত মরক্কো এবং আলজেরিয়ার নাগরিক। তারা উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে কিংবা সীমান্তের দীর্ঘ পাথুরে প্রতিরক্ষা দেয়াল (Tarajal breakwater) ধরে সাঁতরে স্পেনের ভূখণ্ডে ঢোকার চেষ্টা করছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় উদ্ধার হওয়া ১৮টি মরদেহের বাইরেও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় সিউটা প্রশাসন মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জাতীয় জরুরি অবস্থা জারির আবেদন জানিয়েছে। একই সাথে মরক্কো সীমান্ত সম্পূর্ণ সিল করে দেওয়ার এবং জননিরাপত্তা রক্ষায় সীমান্তে সেনাবাহিনী মোতায়েনের জোর দাবি জানানো হয়েছে। সিউটার প্রেসিডেন্ট ভিভাস এক রেডিও সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমরা এক চরম মানবিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যে রয়েছি। এই মুহূর্তে একটি সমন্বিত কমান্ডের মাধ্যমে দ্রুত এবং শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।”

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ (Pedro Sánchez) জানিয়েছেন, তার সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং সীমানা রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইতোমধ্যে সীমান্তে টহলরত সিভিল গার্ড (Guardia Civil) বাহিনীর সহায়তায় অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্থায়ীভাবে মোতায়েন থাকা ৬০ জন সৈন্যের বাইরে আরও অতিরিক্ত কয়েক প্লাটুন সৈন্য সীমান্তে পাঠানো হয়েছে এবং আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। তবে আইনি জটিলতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

এই সংকটের মূলে স্পেনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী এবং মরক্কোর মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপের চিত্র ফুটে উঠেছে। স্প্যানিশ পুলিশ ইউনিয়নগুলো (Sup এবং Jupol) সরাসরি অভিযোগ করেছে যে, মরক্কো কর্তৃপক্ষ সীমান্ত রক্ষায় এবং অভিবাসীদের ঠেকাতে কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না। তাদের দাবি, মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী উদাসীন থাকায় স্পেনের নিরাপত্তা কর্মীরা একা এই বিশাল জনস্রোত সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং পুরো সীমান্ত ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। তবে মরক্কো এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছে যে, তারা মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি পালন করছে এবং স্পেনের সাথে তাদের সীমান্ত সহযোগিতা প্রশংসনীয়।

তদন্তকারী ও প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, মানবপাচারকারী চক্রগুলো স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায়কে অত্যন্ত চতুরভাবে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আদালতের ওই রায়ে সীমান্ত থেকে অভিবাসীদের তাৎক্ষণিক পুশব্যাক বা দ্রুত ফেরত পাঠানোকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাচারকারীরা এই আইনি সুযোগের কথা প্রচার করে তরুণ অভিবাসীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে নামতে প্ররোচিত করছে।

স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফেরনান্দো গ্রান্দে-মারলাসকা (Fernando Grande-Marlaska) জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি পরিদর্শনে সিউটা যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, মরক্কোর সাথে সমন্বয় করে দ্রুততম সময়ে অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। উল্লেখ্য যে, গত এক বছরে এই বিপজ্জনক সমুদ্রপথে সাঁতরে পার হতে গিয়ে অন্তত ৭০ জন অভিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতির পর সেখানে সেনা টহল ও নজরদারি আরও কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে।

স্পেনের সেউতায় এক সপ্তাহে ১,৫০০-এর বেশি অভিবাসী প্রবেশ করেছেন; প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনার মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করছে স্প্যানিশ সরকার।

corriere

TAGGED:
Share This Article