মিলানে দীর্ঘ এক যুগের আইনি বিরোধের পর ইবাদত কেন্দ্র নিয়ে বিরোধের অবসান: নতুন ঠিকানায় স্থানান্তরিত হচ্ছে ‘মিলান মুসলিম সেন্টার’

5 Min Read

ভিয়া কাভালকান্তির বিতর্কিত কেন্দ্রটি বন্ধে আবাসিকদের সাথে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত; পাশেই ভিয়া মেরানোতে নতুন পরিসরে কার্যক্রম শুরু করায় স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি।

রোম, ইতালি

ইতালির বাণিজ্যিক রাজধানী মিলানে ইবাদত করার জায়গা নিয়ে দীর্ঘ ১২ বছরের এক আইনি ও সামাজিক লড়াইয়ের অবসান ঘটেছে। শহরের কেন্দ্রীয় স্টেশনের অদূরে ভিয়া কাভালকান্তির একটি আবাসিক ভবনের নিচে পরিচালিত ইবাদত কেন্দ্রটি শেষ পর্যন্ত সরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা এই বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে, যার ফলে ওই নির্দিষ্ট স্থানে আর কোনো ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হবে না। তবে মুসল্লিদের প্রয়োজনে পাশেই নতুন একটি ইবাদত গাহ চালু করা হয়েছে, যা নিয়ে পুনরায় প্রশাসনিক জটিলতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আইনি লড়াই

ভিয়া কাভালকান্তি ৮ নম্বর বাড়ির ভূগর্ভস্থ একটি গুদামঘরে প্রায় এক যুগ আগে ‘মিলান মুসলিম সেন্টার’ তাদের কার্যক্রম শুরু করে। মূলত স্থানীয় প্রবাসী মুসলিম কমিউনিটি, বিশেষ করে কয়েকশ বাংলাদেশি কর্মজীবী ও ব্যবসায়ীদের জন্য এটি ছিল প্রাত্যহিক এবং জুমার নামাজ আদায়ের প্রধান কেন্দ্র। ২০১৪ সাল থেকে ওই ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা এই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা শুরু করেন। তাদের মূল অভিযোগ ছিল—আবাসিক ভবনের বেজমেন্টে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের আনাগোনা নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি ভবনের সাধারণ নিয়মাবলীর পরিপন্থী।

বিগত ১২ বছরে এই মামলাটি ইতালির বিচার ব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি স্তরে পৌঁছেছে। কয়েক হাজার পৃষ্ঠার আইনি নথি, ডজনখানেক রায় এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের চক্কর শেষে ২০২৬ সালের জুলাই মাসের শুরুতে একটি চূড়ান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে কখনো আদালত কেন্দ্রটি বন্ধের আদেশ দিয়েছে, আবার কখনো আপিলে সেটি স্থগিত হয়েছে। এমনকি ২০২৪ সালে মিলান সিটি কাউন্সিল (Comune di Milano) জায়গাটি বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নিলেও আইনি মারপ্যাঁচে তা সফল হয়নি।

সমঝোতা চুক্তির শর্তাবলী

সাম্প্রতিক চুক্তিতে বলা হয়েছে, মিলান মুসলিম সেন্টার ওই ভবনের বাসিন্দাদের বকেয়া কন্ডোমিনিয়াম বা রক্ষণাবেক্ষণ খরচের একটি বড় অংশ ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদান করবে। বিনিময়ে ভবন কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে চলমান সকল আইনি ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে নেবে। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—এই গুদামঘরটি বর্তমানে ইবাদত কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও ভবিষ্যতে এটি আর কখনোই ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করা যাবে না। এমনকি এটি যদি অন্য কারো কাছে বিক্রিও করা হয়, তবুও ইবাদত গাহ হিসেবে এর ব্যবহার স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ থাকবে। বর্তমানে জায়গাটি বিক্রির জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে

কমিউনিটির প্রয়োজনীয়তা ও নতুন ঠিকানা

ভিয়া কাভালকান্তির এই কেন্দ্রটিতে প্রতি শুক্রবার এবং পবিত্র রমজান মাসে প্রায় ৪০০ মুসল্লি সমবেত হতেন। মিলানের কেন্দ্রীয় স্টেশনের আশেপাশে কর্মরত অনেক প্রবাসী বিশেষ করে বাংলাদেশিরা কাজের ফাঁকে নামাজ আদায়ের জন্য এই কেন্দ্রটির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। সিটি কাউন্সিলের পক্ষ থেকে বড় কোনো স্থায়ী জায়গা বরাদ্দ না থাকায় বাধ্য হয়েই মুসল্লিরা সীমিত পরিসরের এই ইবাদত গাহটি ব্যবহার করে আসছিলেন।

পুরনো কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ‘মিলান মুসলিম সেন্টার’ পাশেই ভিয়া মেরানোতে (Via Merano) তাদের নতুন কার্যক্রম শুরু করেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, নতুন এই কেন্দ্রের প্রবেশপথ ইতিমধ্যে সংস্কার করা হয়েছে এবং সেখানে প্রতিষ্ঠানের নামযুক্ত সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। তবে এই নতুন স্থানটিকে ঘিরেও স্থানীয় প্রশাসনের সুর বেশ কঠোর। সিটি কাউন্সিলরদের দাবি, ভিয়া মেরানোর নতুন ভবনটির জন্যও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমতি বা ‘কাল্ট পারমিট’ (Permesso di culto) নেওয়া হয়নি।

ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি ও প্রশাসনের অবস্থান

মিলান সিটি কাউন্সিলের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, অনুমতিহীন জায়গায় ইবাদত কেন্দ্র পরিচালনার বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রয়োজনে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, মিলানের মতো বড় শহরে পর্যাপ্ত স্বীকৃত ইবাদত গাহের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে যারা কেন্দ্রীয় স্টেশনের আশেপাশে কাজ করেন, তাদের জন্য দূরবর্তী বড় ইবাদত গাহগুলোতে (যেমন পালাশার্প) গিয়ে নামাজ আদায় করা সময়সাপেক্ষ।

এই স্থানান্তরের মাধ্যমে ভিয়া কাভালকান্তির বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অস্বস্তি দূর হলেও মিলানে ইবাদতের অধিকার এবং প্রশাসনিক আইনের মধ্যকার যে ভারসাম্যহীনতা, তা আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। ভিয়া মেরানোর নতুন কেন্দ্রটি স্থায়ীভাবে পরিচালনার অনুমতি পাবে কি না, তা এখন সময়ের অপেক্ষা। এই পুরো প্রক্রিয়াটি মিলানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ধর্মীয় জীবনের ওপর যেমন প্রভাব ফেলছে, তেমনি ইতালির প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে ধর্মীয় অধিকারের বিষয়টি নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।

১২ বছরের আইনি বিরোধের পর মিলানের একটি ইবাদত কেন্দ্র স্থানান্তর হলেও, একই সংগঠন কাছাকাছি আরেকটি ইবাদত কেন্দ্র চালু হয়েছে।

tgcom24

Share This Article