শেনজেন চুক্তি স্থগিত করা নিয়ে স্পেনের কড়া বার্তার জবাবে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি; জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে অন্তত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সীমান্তে কড়াকড়ি বজায় রাখার ঘোষণা রোমের।
ইউরোপের দুই প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইতালি ও স্পেনের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন এখন এক নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। শেনজেন (Schengen) এলাকাভুক্ত দেশ হওয়া সত্ত্বেও স্পেন থেকে আসা যাত্রীদের ওপর ইতালির সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করাকে কেন্দ্র করে এই সংকটের সূত্রপাত। স্প্যানিশ সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা বা আল্টিমেটাম সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইতালি তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ বা নির্দেশ বরদাশত করবে না।
মাদ্রিদের আল্টিমেটাম ও স্পেনের হুঁশিয়ারি
গত কয়েকদিন ধরেই রোমের ‘প্যালাজো চিগি’ (Palazzo Chigi) এবং মাদ্রিদের ‘মনক্লোয়া’ (Moncloa)-র মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলছিল। ঘটনার মোড় নেয় যখন স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সরকার একটি আনুষ্ঠানিক নোটের মাধ্যমে ইতালিকে আগামী রবিবারের মধ্যে সীমান্ত তল্লাশি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রত্যাহারের সময়সীমা বেঁধে দেয়। স্পেনের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছিল, যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইতালি এই কড়াকড়ি বন্ধ না করে, তবে মাদ্রিদও ইতালির বিরুদ্ধে পাল্টা ‘আনুপাতিক ব্যবস্থা’ (Proportionate measures) গ্রহণ করতে বাধ্য হবে।
মেলোনির কঠোর অবস্থান
স্পেনের এই কড়া বার্তার জবাব দিতে ইতালি খুব বেশি সময় নেয়নি। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি অত্যন্ত দৃঢ় ভাষায় স্পেনের এই দাবিকে নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইতালি তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখে। মেলোনির মতে, ইতালি বিদেশের কোনো আল্টিমেটাম বা চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের ফলে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে এখন ব্যাপক ফাটল দেখা দিয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ও নিরাপত্তার যুক্তি
ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসি (Matteo Piantedosi) এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছেন। তিনি জানান, স্পেন থেকে আগত তৃতীয় দেশের নাগরিকদের ওপর এই সাময়িক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) প্রচলিত আইন ও বিধিমালা মেনেই কার্যকর করা হয়েছে। পিয়ান্তেদোসির মতে, এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপ্রসূত পদক্ষেপ নয়, বরং দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি আইনি প্রচেষ্টা। তিনি আরও নিশ্চিত করেছেন যে, অন্তত ১৫ আগস্ট অর্থাৎ ইতালির ঐতিহ্যবাহী উৎসব ‘ফেরাগোস্তো’ (Ferragosto) পর্যন্ত এই সীমান্ত কড়াকড়ি বলবৎ থাকবে। এরপর পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এটি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
শেনজেন স্থগিতাদেশের প্রভাব ও পরবর্তী ধাপ
উল্লেখ্য যে, শেনজেন চুক্তির আওতায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অবাধ চলাচলের বিধান থাকলেও বিশেষ প্রয়োজনে বা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে সদস্য রাষ্ট্রগুলো সাময়িকভাবে এই সুবিধা স্থগিত করতে পারে। ইতালি বর্তমানে সেই বিশেষ অধিকারটিই প্রয়োগ করছে। তবে মাদ্রিদ মনে করছে, ইতালির এই পদক্ষেপ ইউরোপীয় সংহতির পরিপন্থী।
প্যালাজো চিগি থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, স্পেন একটি বন্ধু রাষ্ট্র এবং তাদের প্রতি ইতালির কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ নেই। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে যে ঝুঁকির আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা বিদ্যমান থাকা পর্যন্ত এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শিথিল করা সম্ভব নয়। ঝুঁকি কমে গেলে এবং পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ইতালি পুনরায় আলোচনায় বসতে এবং সীমান্ত ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে প্রস্তুত থাকবে।
দুই দেশের এই কূটনৈতিক লড়াই এখন কোন দিকে মোড় নেয়, তা অনেকটা নির্ভর করছে আগামী রবিবারের পর স্পেনের প্রতিক্রিয়ার ওপর। যদি স্পেন সত্যিই তাদের হুমকির বাস্তবায়ন করে, তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে চলাচলের ক্ষেত্রে অভিবাসী এবং পর্যটকদের বড় ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন ছুটির এই মৌসুমে দুই দেশের সীমান্ত পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।
স্পেনের চাপ প্রত্যাখ্যান করে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত তৃতীয় দেশের নাগরিকদের প্রবেশে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে ইতালি।
rainews


