প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির অভিবাসন নীতিকে চরম ব্যর্থ ও ‘বিপজ্জনক নজির’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিরোধী নেত্রী এলি শ্লাইন; ইতালিতে পুনরায় অভিবাসী ফেরত আসার প্রক্রিয়াকে তিনি ভুল কূটনীতির ফল হিসেবে দেখছেন।
ইতালির বর্তমান সরকার প্রধান জর্জিয়া মেলোনির অভিবাসন সংক্রান্ত প্রচারণামূলক কৌশলগুলো এখন হিতে বিপরীত বা ‘বুমেরাং’ হতে শুরু করেছে। স্পেনের বিরুদ্ধে শেঞ্জেন চুক্তি (Schengen) স্থগিত করার যে রাজনৈতিক চাল মেলোনি চেলেছিলেন, তা এখন ইতালির জন্যই বড় ধরনের কূটনৈতিক সংকট তৈরি করেছে বলে দাবি করছেন বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং সুইজারল্যান্ডের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ফিনল্যান্ডও ইতালি থেকে যাওয়া অভিবাসীদের পুনরায় দেশটিতে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতালির রাজনীতিতে এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ইতালির প্রধান বিরোধী দল পার্তিতো ডেমোক্রাতিকো (PD)-এর নেত্রী এলি শ্লাইন (Elly Schlein) মেলোনি সরকারের এই নীতির তীব্র সমালোচনা করে একে ইতালির জন্য চরম অবমাননাকর বলে অভিহিত করেছেন। শ্লাইনের মতে, মেলোনি স্পেনের সেউটা (Ceuta) ইস্যুতে যে অনমনীয় অবস্থান নিয়েছিলেন, তা ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইতালির অবস্থানকে অত্যন্ত দুর্বল করে দিয়েছে। তিনি একে একটি ‘বিপজ্জনক নজির’ বলে বর্ণনা করেছেন, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
শ্লাইন অভিযোগ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী মেলোনি তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আদর্শের পেছনে অন্ধ হয়ে ব্রাসেলসে (Brussels) ইতালির আসল লড়াইটি করতে ভুলে গেছেন। তিনি বলেন, ইতালির জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রধান দাবি ছিল ইউরোপীয় সংহতি এবং অভিবাসীদের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার বিষয়ে একটি স্থায়ী সমাধান আনা। কিন্তু মেলোনি সেই পথে না হেঁটে স্রেফ সস্তা রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা এবং প্রচারণার পেছনে সময় ব্যয় করেছেন।

এই সংকটের মূলে রয়েছে ইউরোপের বিতর্কিত ‘ডাবলিন রেগুলেশন’ (Dublin Regulation)। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অভিবাসী ইউরোপের যে দেশে প্রথম পা রাখবেন, সেই দেশকেই তার সব দায়-দায়িত্ব নিতে হয়। শ্লাইন দাবি করেন, মেলোনি এই ‘প্রথম প্রবেশ দেশ’ (First country of entry) নীতি সংস্কার করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “যারা ইতালিতে ঢুকছে, তারা আসলে ইউরোপে ঢুকছে। সুতরাং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিটি সদস্য দেশের উচিত সমানভাবে এই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া।” শ্লাইন আরও উল্লেখ করেন যে, অভিবাসীরা কোনো কুরিয়ারের পার্সেল বা পণ্য নয় যে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের জন্য তাদের যখন-তখন এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছুড়ে দেওয়া যাবে।
মেলোনি সরকার অভিবাসন সংকট মোকাবিলায় আলবেনিয়াতে যে ডিটেনশন সেন্টারগুলো নির্মাণ করেছে, সেগুলোকে ‘ব্যর্থ প্রজেক্ট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এলি শ্লাইন। তিনি বলেন, এই কেন্দ্রগুলো কেবল অমানবিক এবং অবৈধই নয়, বরং এগুলো এখন পর্যন্ত শূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। অথচ এর পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। মেলোনি যখন দাবি করছেন যে তিনি ইউরোপের অভিবাসন রাজনীতিতে নতুন সুর এনেছেন, তখন শ্লাইন সেই দাবিকে ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার মতে, মেলোনি আসলে সেই সব ইউরোপীয় দেশগুলোকেই সুবিধা করে দিচ্ছেন যারা অভিবাসীদের দায়িত্ব নিতে চায় না।
এই পরিস্থিতির ফলে ইতালিতে থাকা বিদেশি শ্রমিক ও অভিবাসীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যারা ইতালি হয়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশে কর্মসংস্থানের খোঁজ করছেন, তারা এখন নতুন আইনি জটিলতার মুখে পড়তে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, মেলোনির এই ‘Propaganda’ বা প্রচারসর্বস্ব রাজনীতি যদি পরিবর্তন না হয়, তবে ইতালিকে ভবিষ্যতে অভিবাসীদের বিশাল চাপের বোঝা একাই বইতে হবে। এলি শ্লাইনের এই কড়া সমালোচনা মেলোনি সরকারের ওপর নতুন করে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মেলোনির অভিবাসন নীতি উল্টো ফল দিচ্ছে—আরও ইউরোপীয় দেশ ইতালি হয়ে প্রবেশকারী অভিবাসীদের ফেরত পাঠাতে চাইছে, অথচ ডাবলিন নীতির আওতায় ইউরোপীয় সংহতি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
videoembed.ansa


