ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে ইতালিতে অভিবাসনের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমলেও এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে আগতদের সংখ্যায় বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে একক দেশ হিসেবে ইতালির ‘আনাগ্রাফে’ বা জনসংখ্যা নিবন্ধনে বাংলাদেশিরা এখন সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন।
ইতালির জনতাত্ত্বিক কাঠামো ও অভিবাসনের মানচিত্রে গত তিন বছরে এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইস্তাত (Istat) এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তথ্যমতে, প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার নতুন মানুষ বিদেশ থেকে এসে ইতালির বিভিন্ন শহরে বসতি স্থাপন করছেন। তবে চমকপ্রদ তথ্য হলো, গত তিন বছরে ইতালিতে নতুন করে আসা ইউরোপীয় ও আমেরিকানদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেলেও এশীয় ও আফ্রিকানদের হার হু হু করে বাড়ছে। বিশেষ করে একক দেশ হিসেবে নতুন অভিবাসীদের তালিকায় ইতালি মাত করছে বাংলাদেশিরা।
এশীয় অভিবাসীদের দাপট ও বাংলাদেশের অবস্থান
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইতালিতে বিদেশ থেকে মোট ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৯১৬ জন নতুন বাসিন্দা নিবন্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে এশিয়া মহাদেশ থেকে আসা মানুষের সংখ্যা ৯৪ হাজার ৬৮৮ থেকে বেড়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৬৪৭ জনে দাঁড়িয়েছে, যা দুই বছরের ব্যবধানে প্রায় ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি। এর ফলে এশিয়া এখন আফ্রিকা মহাদেশকে ছাড়িয়ে ইউরোপের পর ইতালিতে অভিবাসনের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসে পরিণত হয়েছে।
এই বিশাল প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হলো বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ ৩৭ হাজার ৪৯৪ জন নতুন অভিবাসী ইতালির ‘আনাগ্রাফে’ নিবন্ধিত হয়েছেন। গত তিন বছরে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশের ঠিক পরেই অবস্থান করছে মরক্কো। দেশটি থেকে ৩৬ হাজার ৪২৫ জন নতুন অভিবাসী এসেছেন, যা দুই বছরের ব্যবধানে ৭১ দশমিক ৬ শতাংশের এক বিশাল উল্লম্ফন। মজার বিষয় হলো, বর্তমানে ইতালিতে প্রতি ছয়জন নতুন অভিবাসীর মধ্যে একজন হয় বাংলাদেশি অথবা মরক্কোর নাগরিক।
অন্যান্য দেশের চিত্র ও এশিয়ার উত্থান
বাংলাদেশ ছাড়াও এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন পাকিস্তান থেকে আগতদের সংখ্যা ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ভারত থেকে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেছে শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে; দেশটিতে অভিবাসনের হার ২ হাজার ৮৭৬ থেকে বেড়ে ৭ হাজার ২৯৪ জনে পৌঁছেছে, যা ১৫৩ দশমিক ৬ শতাংশের এক বিশাল বৃদ্ধি। অন্যদিকে, চীনের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা ভিন্ন; দেশটি থেকে ইতালিতে আসা মানুষের সংখ্যা ৬ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে আসা মোট অভিবাসীর সংখ্যাও ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ১১ হাজার ৮২১ জনে ঠেকেছে।

ইউরোপ ও আমেরিকায় নেতিবাচক প্রবণতা
ঐতিহ্যগতভাবে ইতালিতে ইউরোপীয় দেশগুলোর মানুষেরা বেশি আসলেও এখন সেই চিত্র উল্টে গেছে। রোমানিয়া থেকে আসা অভিবাসীর সংখ্যা ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে এবং আলবেনিয়া থেকেও আসার হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এমনকি যুক্তরাজ্য ও জার্মানি থেকেও আসা মানুষের সংখ্যা নিম্নমুখী
একই অবস্থা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর ক্ষেত্রেও। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে ইতালিতে আসা মানুষের সংখ্যা যথাক্রমে ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে ইতালির ‘ইউরে সাঙ্গুইনিস’ (iure sanguinis) বা বংশোদ্ভূত নাগরিকত্ব আইনের সাম্প্রতিক সংস্কারকে। আগে বংশগত সূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার যে স্বয়ংক্রিয় সুবিধা ছিল, নতুন আইনে সেখানে কঠোর কিছু শর্ত ও সীমা আরোপ করায় ল্যাটিন আমেরিকার ইতালীয় বংশোদ্ভূতদের আসা কমে গেছে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও গুরুত্ব
ইতালি বর্তমানে তার জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখতে বিদেশি অভিবাসীদের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট অভিবাসনের ৮৭ শতাংশই বিদেশি নাগরিক (৩ লাখ ৮৩ হাজার), যেখানে প্রবাসী ইতালীয়দের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সংখ্যা মাত্র ৫৬ হাজার বা ১৩ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপীয়দের অনাগ্রহের বিপরীতে এশীয়দের, বিশেষ করে বাংলাদেশিদের এই ব্যাপক হারে ইতালিতে আগমন দেশটির অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে তাদের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। তবে মরক্কো ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর আকাশচুম্বী প্রবৃদ্ধিও ইতালির ভবিষ্যৎ অভিবাসন নীতিতে নতুন কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েই যাচ্ছে।
ইতালির ১০৬টি প্রধান শহরে গত তিন বছরে নিট ৩ লাখ ২৮ হাজার নতুন বাসিন্দা যোগ হওয়া দেশটির আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। এই ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতির ওপর ইতালীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।
২০২৫ সালে বিদেশ থেকে ইতালিতে আগমন প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজারে স্থিতিশীল থাকলেও ইউরোপ ও আমেরিকার অংশ কমেছে; এশিয়া ও আফ্রিকার প্রবাহ বেড়েছে, নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও মরক্কো।
ilsole24ore


