ইতালির জনপ্রিয় ফুড ডেলিভারি অ্যাপ গ্লোভোর বিরুদ্ধে রাইডারদের ন্যায্য মজুরি না দেওয়া এবং কর্মসংস্থানের ধরন নিয়ে আইনি তদন্ত শুরু করেছে মিলান প্রসিকিউটর অফিস। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অ্যালগরিদমের কারসাজিতে রাইডারদের কাজের প্রকৃত সময় কমিয়ে দেখানোর মাধ্যমে বড় ধরনের মজুরি বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
ইতালিতে ডেলিভারি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোভোর (Glovo) ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও রাইডারদের মজুরি কাঠামো নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির বিচার বিভাগ। মিলান প্রসিকিউটর অফিসের (Procura di Milano) পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, রাইডারদের বেতন বৃদ্ধির যে দাবি প্রতিষ্ঠানটি করছে, তা বাস্তবে কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। পর্দার আড়ালে এক রহস্যময় ‘অ্যালগরিদম’ ব্যবহার করে কর্মীদের প্রাপ্য পাওনা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এই পরিস্থিতির ফলে ইতালিতে বসবাসরত হাজার হাজার প্রবাসী ডেলিভারি কর্মী, যাদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশি, তারা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
অ্যালগরিদমের মাধ্যমে মজুরি কর্তনের অভিযোগ
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, গ্লোভো রাইডারদের মজুরি গণনার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ অ্যালগরিদম ব্যবহার করে, যা রাইডারদের প্রকৃত কাজের সময়কে ‘ক্যালমিয়েটেড’ বা কৃত্রিমভাবে কমিয়ে হিসাব করে। উদাহরণস্বরূপ, একজন রাইডার যদি বাস্তবে ১০ ঘণ্টা কাজ করেন, তবে এই সফটওয়্যারের হিসাবে তাকে মাত্র ৭ ঘণ্টার মজুরি দেওয়া হয়।
বর্তমানে কার্যকর চুক্তি অনুযায়ী, একজন রাইডার যখন রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার গ্রহণ করেন এবং গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দেন, কেবল সেই সময়টুকুই ‘কাজের সময়’ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু খাবার সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করা বা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার সময়টুকুকে মজুরির আওতায় আনা হয় না। এর ফলে একজন কর্মী তার কর্মঘণ্টার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বা অর্ধেকের মজুরি হাতে পান। যদিও কাগজে-কলমে প্রতি ঘণ্টায় ১৪ ইউরো উপার্জনের কথা বলা হয়, কিন্তু প্রকৃত হিসাবে তা অনেক ক্ষেত্রে ৭ ইউরোর নিচে নেমে আসে।
মজুরি বৃদ্ধি বনাম অতিরিক্ত পরিশ্রম
তদন্তে আরও দেখা গেছে, আগে ডেলিভারি প্রতি ২.৫০ ইউরো দেওয়া হলেও বর্তমানে তা বাড়িয়ে ৩ ইউরো করা হয়েছে। তবে এই সামান্য বৃদ্ধির আড়ালে কাজের বোঝা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে যেখানে স্বল্প দূরত্বে ডেলিভারি দেওয়া যেত, এখন রাইডারদের ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে গিয়ে খাবার পৌঁছে দিতে হচ্ছে। এর ফলে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ ও শারীরিক পরিশ্রমের তুলনায় এই বর্ধিত মজুরি রাইডারদের কাছে কোনো সুফল বয়ে আনছে না।

স্থায়ী নিয়োগের দাবি
মিলান প্রসিকিউটর অফিস কেবল তদন্তেই সীমাবদ্ধ নেই; তারা আদালতকে অনুরোধ জানিয়েছে যেন গ্লোভোকে তাদের রাইডারদের ‘স্থায়ী কর্মী’ (Assunzione) হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য করা হয়। প্রসিকিউটরদের মতে, ফ্রিল্যান্সার বা স্বাধীন কন্ট্রাক্টর হিসেবে নয়, বরং নিয়মিত কর্মী হিসেবে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে করে রাইডাররা একটি সম্মানজনক বেতন পাওয়ার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারবেন।
জীবনযাত্রার সংকট ও প্রতিকূল পরিবেশ
ইতালিতে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের তুলনায় রাইডারদের আয় অত্যন্ত নগণ্য। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সাক্ষাৎকারে একজন রাইডার জানান, তারা এক কামরার একটি ঘরে পাঁচজন গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। এছাড়া তীব্র গরমের সময় অ্যাপের পক্ষ থেকে সাইকেল চালক রাইডারদের দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয় না। গরম থেকে সুরক্ষার দোহাই দিয়ে কাজ বন্ধ রাখলেও, এই কয়েক ঘণ্টার আয়ের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি কোনো আর্থিক সহায়তা প্রদান করে না, যা রাইডারদের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে আরও হিমশিম খেতে বাধ্য করে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব
এই তদন্তের ফলাফল ইতালির ডেলিভারি খাতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গ্লোভো বর্তমানে বিচার বিভাগীয় নিয়ন্ত্রণের (Controllo Giudiziario) অধীনে রয়েছে। যদি এই মামলায় প্রসিকিউটরদের দাবি অনুযায়ী রাইডারদের স্থায়ী নিয়োগের আদেশ আসে, তবে তা ইতালির শ্রমবাজারে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। বিশেষ করে যারা বাইক বা সাইকেলে করে এই হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছেন, তাদের জন্য এটি বড় ধরনের আইনি বিজয় হিসেবে গণ্য হবে। বর্তমানে কয়েক হাজার বিদেশি রাইডার এই মামলার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছেন।
মিলানের প্রসিকিউশন অভিযোগ করেছে, গোপন অ্যালগরিদমের কারণে গ্লোভো রাইডারদের প্রকৃত কাজের পুরো সময়ের পারিশ্রমিক দিচ্ছে না; ১০ ঘণ্টার কাজের মধ্যে মাত্র ৭ ঘণ্টার মজুরি মিলছে।
ansa


