ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় ফoggia (ফoggia) প্রদেশে নিখোঁজ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর এক পাকিস্তানি শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে; তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, কৃষি খাতে অবৈধ মধ্যস্থতা বা ‘কাপোরালাতো’ (Caporalato) সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
ইতালির কৃষি খামারগুলোতে অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর শোষণ ও অবৈধ শ্রম বাজারের যে অন্ধকার চিত্র প্রায়শই সামনে আসে, ৩২ বছর বয়সী সাদামের মৃত্যু সেই সংকটেরই এক মর্মান্তিক প্রতিফলন। গত ৪ আগস্ট নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ ১৭ দিন পর ২১ আগস্ট ফoggia এবং মানফ্রেদোনিয়া (Manfredonia) মধ্যবর্তী বোরগো মেজানোন (Borgo Mezzanone) এলাকার একটি নির্জন স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সাদামের নিজের গাড়ির ডিকিতে কাপড় দিয়ে ঢাকা অবস্থায় মরদেহটি পাওয়া যায়।
হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা ও ময়নাতদন্তের তথ্য
মরদেহ উদ্ধারের পর ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সাদামকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। ফoggia পলিক্লিনিকের ফরেনসিক মেডিসিন ইনস্টিটিউটে অধ্যাপক লুইজি চিপোলোনির তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ চার ঘণ্টা ধরে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, হত্যার আগে সাদামকে প্রচণ্ড শারীরিক নির্যাতন বা মারধর করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে শরীরের বিভিন্ন অংশে ছুরিকাঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। তীব্র দাবদাহের কারণে গাড়ির ডিকির ভেতর তাপমাত্রা প্রায় ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল, যার ফলে মরদেহটি মারাত্মকভাবে পচে গিয়েছিল। এই পচনশীল অবস্থার কারণে মৃত্যুর সঠিক সময় ও কারণ নির্ণয় করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তদন্তে উঠে আসা ‘কাপোরালাতো’ সংযোগ
এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি দিয়েছেন নিহতের ভাই নাজিম হুসেইন। তিনি ইতালীয় পুলিশের (Carabinieri) কাছে একটি চিরকুট জমা দিয়েছেন, যা এক বন্ধুর সহায়তায় ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল। ওই চিরকুটে নাজিম দাবি করেছেন যে, তার ভাই সাদাম কেবল একজন সাধারণ কৃষি শ্রমিক ছিলেন না, বরং তিনি ইতালীয় খামার মালিক এবং সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী বা ‘কাপোরাল’ (Caporale) হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন।
সদামের অধীনে নিয়মিত চার থেকে পাঁচজন পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করতেন। সাদাম নিজেই তার গাড়িতে করে শ্রমিকদের কর্মস্থলে নিয়ে যেতেন এবং খামার মালিকদের সাথে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করতেন। পুলিশের ধারণা, এই অবৈধ শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থ লেনদেন নিয়ে অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী চক্রের সাথে বিরোধের জেরে এই ‘হত্যাকাণ্ড’ বা ‘রেভেন্স কিলিং’ ঘটে থাকতে পারে।

পরিবার ও সহকর্মীদের বক্তব্য
সদামের রুমমেট আরশাদ, যিনি গত শীতকালে তার সাথে মানফ্রেদোনিয়া এলাকায় বসবাস করতেন, তিনি সাদামকে একজন সৎ ও শান্ত প্রকৃতির মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আরশাদের মতে, সাদামের সাথে পাকিস্তানি বা অন্য কোনো দেশের অভিবাসীদের কখনোই কোনো ঝামেলা ছিল না। চার বছর আগে উন্নত জীবনের আশায় ইতালি আসা সাদামের এমন করুণ মৃত্যু তার পরিবারকে শোকাচ্ছন্ন করে তুলেছে। বিশেষ করে পাকিস্তানে অবস্থানরত তার বৃদ্ধা মা সন্তানের ফেরার পথ চেয়ে দিন গুনছিলেন। এখন ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার পর মরদেহটি পাকিস্তানে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সাদামের ভাই নাজিম এখন তার ভাইয়ের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং উপযুক্ত বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের জন্য গুরুত্ব
এই ঘটনাটি ইতালিতে কর্মরত দক্ষিণ এশীয় বিশেষ করে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি পুনরায় সামনে এনেছে। ইতালির কৃষি প্রধান এলাকাগুলোতে অবৈধ শ্রমিক সরবরাহকারীরা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে প্রায়শই সাধারণ শ্রমিক বা ক্ষুদ্র মধ্যস্থতাকারীরা প্রাণ হারান। ইতালীয় কর্তৃপক্ষ কৃষি খাতের এই ‘কাপোরালাতো’ প্রথা নির্মূলে কঠোর আইন ও বিনিয়োগের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। পুলিশের তদন্ত এখন সাদামের সেই দ্বিতীয় ফোন নম্বর এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে এগোচ্ছে, যেখান থেকে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের হোতাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্রিন্ডিসি নয়, ফ্রগিয়ার কাছে বোর্গো মেজ্জানোনে ৩২ বছর বয়সী সাদামের মরদেহ গাড়ির ডিকিতে উদ্ধার হয়; তদন্তে কৃষিশ্রমিক শোষণচক্র ‘ক্যাপোরালাতো’ ও সম্ভাব্য ‘রেগুলামেন্টো দি কন্তি’র যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
bari.repubblica


