কৃষি খামারে কাজের মিথ্যা সুযোগ দেখিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ৮১ জন অভিবাসীকে ইতালিতে এনে অবৈধ করার অভিযোগ। ‘ডিক্রি ফ্লুসি’র নাম করে জনপ্রতি ৫ থেকে ১৫ হাজার ইউরো হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি।
ইতালিতে বৈধ উপায়ে কর্মী আনার সরকারি কর্মসূচি বা ‘ডিক্রি ফ্লুসি’ (Decreto Flussi) ব্যবহার করে ভুয়া নিয়োগের মাধ্যমে অভিবাসী আনার এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। ইতালির মানতোভা (Mantova) এলাকায় অভিযান চালিয়ে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও মরক্কোর মতো দেশগুলো থেকে আসা ৮১ জন অভিবাসীকে ভুয়া কাজের চুক্তি দেখিয়ে অবৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশ করতে সাহায্য করেছেন। ইতালিতে পৌঁছানোর পর এসব কর্মীকে কোনো কাজ না দিয়ে সম্পূর্ণ অনথিভুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হতো।
ইতালির সামরিক পুলিশ বা কারাবিনিয়েরি (Carabinieri) এবং মানতোভা সরকারি কৌঁসুলি কার্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘ক্লিক ডে’ (Click Day) নামক এক বিশেষ অভিযানে এই প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করা হয়। তদন্তকারীদের তথ্যমতে, বর্তমানে তিন অভিযুক্তকে গৃহবন্দী (Arresti Domiciliari) করা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন এক ৬৪ বছর বয়সী কৃষি খামারের মালিক, ৫১ বছর বয়সী এক শ্রম বিষয়ক উপদেষ্টা বা লেবার কনসালট্যান্ট এবং ৪৩ বছর বয়সী এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত দোভাষী ও সাংস্কৃতিক মধ্যস্থতাকারী (Cultural Mediator)। এছাড়াও এ মামলায় ৮২ বছর বয়সী আরেকজন লেবার কনসালট্যান্ট এবং ৩৮ বছর বয়সী এক ভারতীয় মধ্যস্থতাকারীকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুরো চক্রটির বিরুদ্ধে অবৈধ অভিবাসনে সহযোগিতা এবং অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে যে, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে এই চক্রটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল। তারা মূলত নিজ দেশ থেকে ইউরোপে আসার জন্য ব্যাকুল ও মানসিকভাবে দুর্বল অভিবাসীদের টার্গেট করত। ইতালি এবং বিভিন্ন উৎস দেশের দালালদের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের চিহ্নিত করা হতো। এরপর ইতালির প্রিফেকচার (Prefetture) বা স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যালয়ের ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ বা স্পোর্তেলো ইউনিকো (Sportello Unico)-তে ভুয়া নথিপত্র দাখিল করা হতো। তারা এমন এক ভুয়া কৃষি খামারের অনুকূলে কাজের আবেদন করতো যার কোনো বাস্তব অস্তিত্বই ছিল না। এছাড়াও নথিপত্রে খামারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, কর্মীদের জন্য উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত আবাদি জমির সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ উপস্থাপন করা হতো।

ইউরোপে আসার স্বপ্নে বিভোর থাকা এসব অভিবাসী ইতালির ভিসা এবং কাজ পাওয়ার আশায় একেকজন ৫ হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত এই চক্রকে প্রদান করেছিলেন। আবেদনের পর তাদের অনুকূলে কাজের অনুমতি বা ‘নুল্লা ওস্তা’ (Nulla Osta) মঞ্জুর করা হতো। এই ছাড়পত্র দেখিয়ে ইতালির দূতাবাস থেকে ভিসা সংগ্রহ করে যখন তারা ইতালিতে আসতেন, তখন আসল প্রতারণা শুরু হতো। ইতালিতে পা রাখার পর ওই ভুয়া নিয়োগকর্তা কোনো চুক্তি স্বাক্ষর না করে সম্পূর্ণ বেপাত্তা বা অনুপস্থিত হয়ে যেতেন। ফলে কাজ না পাওয়ায় এবং আনুষ্ঠানিক চুক্তি না হওয়ায় বৈধ ভিসা নিয়ে আসার পরও এই অভিবাসীরা ইতালিতে সম্পূর্ণ অবৈধ হয়ে পড়তেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার ও তল্লাশি অভিযানের সময় বিপুল পরিমাণ জাল নথিপত্র এবং কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ জব্দ করা হয়েছে। এই জালিয়াতির মাধ্যমে চক্রটি বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে উপার্জন করেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এই চক্রের সাথে আর কোনো নিয়োগকর্তা বা দালাল জড়িত রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
ইতালিতে বাংলাদেশিদের জন্য এই খবরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা ডিক্রি ফ্লুসি বা স্পন্সর ভিসায় ইতালিতে আসার চেষ্টা করছেন, তাদের দালালের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। অনেক সময় ভুয়া কোম্পানির আড়ালে ভিসা হলেও ইতালিতে এসে কাজের চুক্তি না পাওয়ায় সর্বস্বান্ত হতে হয়। তাই যেকোনো অর্থ লেনদেনের আগে নিয়োগকর্তা ও খামারের সত্যতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি
মান্তোভায় ৮১ বিদেশি শ্রমিককে ভুয়া কৃষি চাকরি ও ভিসার প্রলোভন দেখিয়ে ৫–১৫ হাজার ইউরো নেওয়ার অভিযোগে তিনজনকে গৃহবন্দি করেছে কারাবিনিয়ারি।
ansa


