ইতালির ভেনিসে মসজিদ নির্মাণ ইস্যুতে মেয়রের দেওয়া ‘আগে একীভূতকরণ, পরে উপাসনালয়’ শর্তকে রাজনৈতিক অজুহাত হিসেবে আখ্যা দিয়ে স্বচ্ছ ও কার্যকর সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট বাংলাদেশি অধিকারকর্মী ঋতু মিয়া।
ইতালির ভেনিস সংলগ্ন মেস্ত্রে (Mestre) এলাকায় একটি স্থায়ী মসজিদ নির্মাণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক এখন নতুন মোড় নিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মসজিদ নির্মাণের অনুমতির বিপরীতে কিছু কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটি এবং বিশেষ করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অধিকারকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। মেস্ত্রের মেয়র ভেন্তুরিনি (Sindaco Venturini) সম্প্রতি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অভিবাসীদের আগে স্থানীয় সমাজের সাথে পূর্ণাঙ্গভাবে একীভূত হতে হবে, তবেই মসজিদের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ভেনিসের বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম প্রভাবশালী ও বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং নারী অধিকারকর্মী ঋতু মিয়া (Rhitu Miah) মেয়রের অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, মেয়রের এই ‘আগে একীভূতকরণ, পরে মসজিদ’ নীতিটি আদতে একটি রাজনৈতিক কৌশল বা অজুহাত ছাড়া আর কিছুই নয়।
ঋতু মিয়া তার প্রতিক্রিয়ায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, ধর্মীয় উপাসনালয় পাওয়ার অধিকার কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার হতে পারে না। মেয়রের বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি বলেন, “নারীর স্বাধীনতা বা অধিকারকে কোনোভাবেই মসজিদের বিনিময়ে দরকষাকষির পণ্য (Merce di scambio) হিসেবে ব্যবহার করা আমি মেনে নিতে পারি না। মসজিদ কোনো ‘পুরস্কার’ নয় যে, কেউ ভালো ব্যবহার করলেই তাকে তা প্রদান করা হবে।” তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন যে, ‘ভালো ব্যবহার’ বা ‘একীভূতকরণ’ পরিমাপ করার কোনো সুনির্দিষ্ট একক বা মাপকাঠি প্রশাসনের কাছে আছে কি না।

ঋতু মিয়ার মতে, যদি প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকে, তবে তাদের উচিত হবে একটি স্বচ্ছ রূপরেখা নিয়ে কমিউনিটির সাথে আলোচনায় বসা। তিনি মেয়রের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আসুন আমরা একটি টেবিলে বসি এবং সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা করি। একটি সুপরিকল্পিত প্রকল্পের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব এবং তা সবার জন্যই ইতিবাচক হবে।”
উল্লেখ্য, ঋতু মিয়া কেবল একজন কর্মীই নন, তিনি মেস্ত্রেতে দীর্ঘ বছর ধরে একটি স্কুল এবং ট্রেনিং সেন্টার পরিচালনা করছেন। তার এই প্রতিষ্ঠানটি অভিবাসীদের মূলধারার ইতালীয় সমাজের সাথে একীভূত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সেখানে অভিবাসীদের নাগরিক শিক্ষা (Educazione civica) প্রদানের পাশাপাশি ইতালীয় ভাষা (Lingua italiana) শেখানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ঋতু মিয়ার দর্শন অনুযায়ী, বিশেষ করে নারী অভিবাসীদের জন্য ইতালীয় ভাষা শেখা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বিশ্বাস করেন, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। তার মতে, “যখন একজন নারী ভাষা আয়ত্ত করেন, তখন তিনি নিজের চিন্তা প্রকাশ করার এবং নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করার সক্ষমতা অর্জন করেন। এটাই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা। ভাষা শিখলে একজন নারী হিজাব পরা বা না পরা কিংবা মসজিদ থাকার বা না থাকার মতো যেকোনো ইস্যুতে নিজের অধিকার দাবি করতে পারেন।”
মেস্ত্রেতে মসজিদের এই সংকট বর্তমানে কেবল স্থানীয় ইস্যু নয়, বরং ইতালির জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ঋতু মিয়ার মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের এই আহ্বান ইতালীয় প্রশাসন এবং অভিবাসী সমাজের মধ্যে বিরাজমান দূরত্ব কমিয়ে একটি সম্মানজনক সমাধানের পথ দেখাতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে মেয়রের এই ‘শর্তাধীন উপাসনালয়’ নীতি যে নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে নতুন তর্কের জন্ম দিয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
মেস্ত্রের মসজিদ ইস্যুতে রিতু মিয়া সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন; তাঁর মতে, নারীর স্বাধীনতা কোনো মসজিদের বিনিময়ের শর্ত নয়, বরং স্পষ্ট পরিকল্পনা ও ইতালীয় ভাষাশিক্ষাই বাস্তব অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি।
rainews


