পিয়ানা দি সিবেরি এলাকায় অমানবিক পরিবেশে শ্রমিকদের আটকে রেখে শোষণ ও অবৈধ অভিবাসনের অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে ইতালীয় পুলিশ। মানবপাচার ও শ্রম-শোষণের এই বিশাল চক্রে ইতালীয়দের পাশাপাশি অভিবাসীরাও জড়িত বলে উঠে এসেছে তদন্তে।
ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকা পিয়ানা দি সিবেরিতে (Piana di Sibari) অবৈধ শ্রম-দালালি বা ‘ক্যাপোরালাতো’ (caporalato) বিরোধী এক বড় অভিযানে এক বাংলাদেশিসহ ২০ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র গড়ে তোলা, অবৈধ মধ্যস্থতা, শ্রম-শোষণ, দাসত্বে বাধ্য করা, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ অভিবাসনে সহায়তার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ১৮ জন পাকিস্তানের, একজন ভারতের এবং একজন বাংলাদেশের নাগরিক।
কাতানজারো শহরের মাফিয়া বিরোধী জেলা অধিদপ্তরের (DDA di Catanzaro) নির্দেশে ইতালীয় সামরিক পুলিশ ক্যারাবিনিয়ারির শ্রম সুরক্ষা কমান্ড এই অভিযান পরিচালনা করে। কোসেনজা, নাপোলি, বোলোনিয়া, সাসারি এবং মানতোভা প্রদেশের স্থানীয় পুলিশ ইউনিটগুলোও এই ‘অপারেশন মাস্টার’ (Operazione Master) নামের অভিযানে যুক্ত ছিল। ২০২০ সালে শুরু হওয়া দীর্ঘ তদন্তে ওই এলাকায় সক্রিয় দুটি ভিন্ন অপরাধী চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়, যারা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করত।
তদন্তকারীদের মতে, বিদেশি নাগরিকদের দ্বারা পরিচালিত প্রথম চক্রটি মূলত পুরো এলাকার কৃষি শ্রমিকদের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। অভিবাসী শ্রমিকদের তারা আক্ষরিক অর্থেই দাসত্ব ও চরম বশ্যতার মধ্যে রাখত। ভুক্তভোগীদের একটি ছোট, জরাজীর্ণ, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও হিটিং ব্যবস্থাহীন স্যাঁতসেঁতে ঘরে গাদাগাদি করে রাখা হতো, যেখানে একসঙ্গে ২০ জন পর্যন্ত ঘুমাতে বাধ্য হতেন। কর্মক্ষেত্রে নেওয়ার সময় ট্রাকে তাঁদের পশুর মতো তোলা হতো এবং প্রতিনিয়ত ভয়ভীতি দেখানো হতো। এই অমানবিক বাসস্থানের জন্য চক্রটি জোরপূর্বক শ্রমিকদের মাসিক বেতন থেকে ৫০-৬০ ইউরো কেটে রাখত।

দ্বিতীয় চক্রটি পরিচালনা করতেন স্থানীয় ইতালীয়রা। এই চক্রের মূল কাজ ছিল অবৈধ অভিবাসনের পথ সুগম করা। তারা মূলত ইতালির বৈধ শ্রমিক আনার স্পন্সরশিপ আইন ‘দেক্রেতো ফ্লুসি’ (Decreto Flussi) এবং করোনা-পরবর্তী ‘দেক্রেতো রিলানচো’ (Decreto Rilancio)-এর সরকারি আইনি প্রক্রিয়াগুলোর ফাঁকফোকর কাজে লাগাত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, তদন্তে স্থানীয় কর ও আইনি সহায়তা কেন্দ্র ‘কাফ ও পাত্রোনাতি’ (Caf e Patronati)-এর কিছু অসাধু কর্মীরও এই চক্রের সাথে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে।
এই অভিযানের পর কাসানো আল’ইওনিও (Cassano All’Ionio) পৌরসভার মেয়র জানপাওলো ইয়াকোবিনি এক বিবৃতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি মাফিয়া বিরোধী অধিদপ্তর এবং ক্যারাবিনিয়ারি পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “শ্রম-শোষণের মতো একটি ভয়াবহ ব্যাধি দূর করতে এই অভিযান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর পর এ ধরনের তদন্ত প্রমাণ করে যে, এই বিষয়ে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।”
মেয়র ইয়াকোবিনি স্থানীয় অর্থনৈতিক ও উৎপাদন খাতে অবৈধ কর্মকাণ্ড রোধে নিরলস কাজ করার জন্য আর্থিক পুলিশ ‘গুয়ার্দিয়া দি ফিনাঞ্জা’ (Guardia di Finanza)-এরও প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “পৌরসভা হিসেবে আমরা বৈধতা, শ্রমিকের মর্যাদা এবং আমাদের অঞ্চলের সুষ্ঠু সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সাথে কাজ চালিয়ে যাব।” একই সাথে এই চক্রগুলোর সাথে স্থানীয় মাফিয়া গোষ্ঠীগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
ক্যালাব্রিয়ার পিয়ানা দি সিব্যারিতে ‘অপারেশন মাস্টার’-এ ২০ জন আটক; শ্রমিক শোষণ, দাসত্ব, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অভিবাসনে সহায়তার গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে।
rainews


