ইতালির কৃষি খামারে আধুনিক দাসত্বের শিকার বিদেশি শ্রমিক: অমানবিক শোষণের দায়ে ছয়জন গৃহবন্দী

3 Min Read

জিনোসা ও মাসাফ্রার খামারগুলোতে নাইজেরিয়া, রোমানিয়া ও আলবেনিয়ার নাগরিকদের ওপর কঠোর নজরদারি ও দাসত্বমূলক শ্রম চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগে বড় ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।

ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় কৃষি এলাকায় বিদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের চরম অমানবিক পরিবেশে আটকে রেখে কাজ করানোর এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। দেশটির পুলিশ পরিচালিত ‘তেরা দি কনফিনে’ (Terra di confine) শীর্ষক এক বিশেষ তদন্ত অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি খাতে অবৈধ শ্রমিক শোষণ বা ‘কাপোরালাতো’র (Caporalato) অভিযোগে ছয়জনকে নিজ বাড়িতে নজরবন্দী বা গৃহবন্দী (Ai domiciliari) করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

তদন্ত নথিপত্র এবং পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলীয় জিনোসা (Ginosa) ও মাসাফ্রার (Massafra) মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ পল্লী এলাকায় বিদেশি শ্রমিকদের এক প্রকার ‘অদৃশ্য কর্মী বাহিনী’ হিসেবে আটকে রাখা হয়েছিল। এসব শ্রমিকের একটি বড় অংশ নাইজেরিয়া, রোমানিয়া ও আলবেনিয়া থেকে ভাগ্যের সন্ধানে ইতালিতে এসেছিলেন। তবে খামারগুলোতে পৌঁছানোর পর তাদের কাজের বাস্তবতা ছিল আধুনিক দাসত্বের সমতুল্য। সাধারণ কর্মদিবস ছাড়াও সরকারি ও ধর্মীয় ছুটির দিনগুলোতেও তাদের কোনো বিরতি দেওয়া হতো না। প্রচণ্ড শারীরিক ক্লান্তির মধ্যেও তাদের টানা শিফটে কাজ করে কমলালেবু, মান্দারিন, আঙুর এবং স্ট্রবেরি তুলতে বাধ্য করা হতো।

মামলার বিবরণীতে ভুক্তভোগী নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের দেওয়া জবানবন্দি থেকে জানা গেছে, খামারে তাদের ন্যূনতম ব্যক্তিস্বাধীনতাও ছিল না। প্রতিদিনের দীর্ঘ কর্মঘণ্টার মধ্যে সামান্য ধূমপানের সুযোগ কিংবা মাঠের ভেতরে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার মতো মৌলিক বিষয়ের জন্যও তাদের দৈনিক মজুরি থেকে টাকা কেটে নেওয়া হতো। খামার মালিক ও তাদের বিশ্বস্ত তত্ত্বাবধায়কদের সার্বক্ষণিক পাহারা এবং দূরনিয়ন্ত্রিত নজরদারির মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের চরম মানসিক চাপে রাখা হতো।

মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে বিশেষভাবে উঠে এসেছে মাতারানো এলাকার বাসিন্দা ৪৬ বছর বয়সী খামার ব্যবসায়ী জিওভান্নি মাজোত্তার (Giovanni Mazzotta) নাম। তদন্তকারীদের মতে, মাজোত্তা তার খামারে কর্মরত শ্রমিকদের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন হরণ করতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অত্যন্ত কঠোর কিছু নিয়ম চালু করেছিলেন। কাজের ফাঁকে শ্রমিকেরা কখন বিশ্রাম পাবেন, দিনে কতবার শৌচাগার ব্যবহার করতে পারবেন, এমনকি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন স্পর্শ করতে পারবেন কি না—তা এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন মাজোত্তা। কর্মীদের কাজের গতি ও গতিবিধি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখতে তিনি খামারের ভেতরে উচ্চপ্রযুক্তির সিসিটিভি ক্যামেরার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কও স্থাপন করেছিলেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুরো তদন্ত অভিযানটি পরিচালনা করেছে ইতালীয় সামরিক পুলিশ কারাবিনিয়ারির বিশেষ তদন্ত শাখা (Nucleo Investigativo) এবং শ্রম পরিদর্শন ইউনিট (Nucleo Ispettorato del Lavoro)। দেশটির সরকারি কৌঁসুলি রেমো এপিফানি (Remo Epifani) ও রাফায়েল কাস্তোর (Raffaele Casto) যৌথ নির্দেশনায় পরিচালিত এ অনুসন্ধান শেষে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ইতালির কৃষি খাতে অভিবাসী শ্রমিকদের মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষা এবং বেআইনি মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট নির্মূলে পরিচালিত এ অভিযানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আধুনিক দাসত্ব, অবৈধ নজরদারি এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট ধারায় বিচারিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।


জিনোসা ও মাসাফ্রায় তদন্তে বিদেশি কৃষিশ্রমিকদের দীর্ঘ সময় কাজ, বিরতি ও শৌচাগার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, মজুরি কাটা এবং ভিডিও নজরদারির মাধ্যমে কঠোর শ্রম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে; ছয়জনকে গৃহবন্দী করেছে ইতালীয় পুলিশ।

lagazzettadelmezzogiorno

Share This Article