ভূমধ্যসাগরে পৃথক অভিযানে অর্ধশতাধিক অভিবাসী উদ্ধার: লিবীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে নৌকায় আগুন দেওয়ার অভিযোগ

4 Min Read

ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ পাড়ি দেওয়ার সময় দুটি বেসরকারি উদ্ধারকারী জাহাজ ৫৫ জন অভিবাসীকে নিরাপদে নিয়ে এসেছে; আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর এই রুটে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা ইতিমধ্যে দুই হাজার ছুঁইছুঁই।

ইউরোপে প্রবেশের বিপজ্জনক সমুদ্রপথ হিসেবে পরিচিত ভূমধ্যসাগরে পৃথক দুটি তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানে নারী ও শিশুসহ অর্ধশতাধিক অভিবাসনপ্রত্যাশীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উত্তর আফ্রিকা উপকূল থেকে ইউরোপমুখী অনিয়মিত ও প্রাণঘাতী যাত্রা অব্যাহত থাকার মধ্যেই আন্তর্জাতিক বেসরকারি সাহায্য সংস্থাগুলোর দুটি জাহাজ তাদের উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থ শিশু ছাড়াও পরিবারহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর রয়েছে। এদের চিকিৎসার জন্য এবং আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপ ও সিসিলির কাতানিয়া বন্দরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর বিবরণ অনুযায়ী, প্রথম অভিযানটি পরিচালনা করে এনজিওভিত্তিক অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী জাহাজ ‘সি-আই ৫’ (Sea-Eye 5)। গত ২১ সেপ্টেম্বর ভোরে মধ্য ভূমধ্যসাগরের উদ্ধার অঞ্চলে একটি চলাচলের অযোগ্য রাবার বোট ভাসতে দেখে জাহাজটির ক্রুরা জরুরি বার্তা পান। বার্তা পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে চরম বিপদের মুখে থাকা ২৪ জন অভিবাসীকে নিরাপদে নিজেদের জাহাজে তুলে নেয় উদ্ধারকারী দলটি। উদ্ধারকর্মীরা জানান, টানা দুই দিন উন্মুক্ত সাগরে ভাসমান থাকায় অভিবাসীরা সম্পূর্ণ নিস্তেজ ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাদের মধ্যে তিন বছর বয়সী এক শিশু তীব্র পানিশূন্যতা ও দুর্বলতায় ভুগছিল। তবে জাহাজে থাকা এক শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তাৎক্ষণিক তৎপরতায় শিশুটির শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়। সি-আই ৫ জাহাজটি এসব অভিবাসীকে ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় লাম্পেদুসা (Lampedusa) দ্বীপে নামানোর উদ্দেশে রওনা হয়েছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাসেবা সংস্থা ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’ বা এমএসএফ (MSF)-এর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘ওইভন’ (Oyvon) অপর এক নাটকীয় অভিযানে ৩১ জনকে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন নারী ও কন্যাশিশু এবং ১২ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক রয়েছে, যাদের মধ্যে নয়জনই অভিভাবকহীন। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এই দলের অধিকাংশ অভিবাসী পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়ার নাগরিক। এমএসএফ জানায়, অভিবাসীদের যেন লিবীয় কোস্টগার্ড পুনরায় সাগরে আটকে লিবিয়ায় ফেরত পাঠাতে না পারে, সে জন্য অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সবাইকে জাহাজে তুলে নেওয়া হয়। উদ্ধার কাজ শেষ হওয়ার পরপরই লিবিয়ার টহল বোট ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিত্যক্ত খালি নৌকাটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখতে পান। উদ্ধারকৃতদের নামানোর জন্য ওইভন জাহাজটিকে ইতালির সিসিলির কাতানিয়া (Catania) বন্দর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

অভিযান প্রসঙ্গে এমএসএফ-এর প্রকল্প সমন্বয়কারী কিয়ারা মিলানিজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া বার্তায় লিবিয়ায় পুশব্যাকের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক নিয়মে সাগরে উদ্ধার হওয়া কাউকে লিবিয়ায় ফেরত পাঠানো উচিত নয়; কারণ সেখানে অভিবাসীদের জোরপূর্বক অর্থ আদায়, বেআইনিভাবে বন্দি রাখা, শারীরিক নির্যাতন ও শোষণের মতো ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও অভিযোগ করছে যে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর সাথে যেসব চুক্তি করেছে, তার অংশ হিসেবে লিবিয়া ও তিউনিসিয়ার বাহিনীগুলো মানুষের ওপর চরম সহিংসতা ও দমনপীড়ন চালাচ্ছে।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপের পথে ভূমধ্যসাগর এখনো বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক রুট। শুধু চলতি বছরেই এই পথে পাড়ি জমাতে গিয়ে প্রায় দুই হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন। তবে অনেক নৌকাডুবির তথ্য প্রকাশ্যে না আসায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


২০২৬ সালে ভূমধ্যসাগরে প্রায় ২,০০০ অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। সাম্প্রতিক দুই অভিযানে Sea-Eye ৫-এর ২৪ জন ও MSF-এর ৩১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।

infomigrants

Share This Article