এক ব্যক্তির অভিবাসন থেকে শুরু হয়ে আজ তা রূপ নিয়েছে বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যে; ১৯টি রেস্তোরাঁ ও হোটেলে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক প্রবাসী বাংলাদেশির।
ঐতিহাসিক সমুদ্রবন্দর ও বিশ্বখ্যাত নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাসের জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত ইতালির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জেনোয়া (Genoa)। শতাব্দী প্রাচীন এই নগরের অলিগলিতে এখন স্পষ্টভাবেই চোখে পড়ে এক টুকরো বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। বিভিন্ন সড়কে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান; যেখানে বাংলাভাষী কর্মীদের পরিচালনায় চলছে দৈনন্দিন ব্যস্ততা। বিশেষ করে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার প্রবাসীদের কাছে জেনোয়া যেন আজ এক আপন ঠিকানা। চার দশকের বেশি সময় ধরে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের হাত ধরে গড়ে ওঠা এক সুদৃঢ় অভিবাসন নেটওয়ার্কের ওপর দাঁড়িয়ে বিকশিত হয়েছে এই প্রবাসী সমাজ।
সাফল্যের এই অসাধারণ যাত্রার সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে, ১৯৮২ সালে। নড়িয়া উপজেলার ঘড়িসার ইউনিয়নের পূর্ব নন্দনশাহ গ্রামের বাসিন্দা লুৎফর রহমান ঢালী প্রথম ইতালি পাড়ি জমান। শুরুতে রাজধানী রোমে থিতু হলেও নিজের অবস্থান শক্ত করার পর তিনি নড়িয়ার স্বজন ও পরিচিতদের জন্য অভিবাসনের পথ সুগম করতে হাত বাড়িয়ে দেন। নতুন আগতদের থাকার জায়গা খোঁজা, কাজের সন্ধান দেওয়া এবং স্থানীয় সহায়তাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে তিনি ছিলেন অগ্রণী। ২০১০ সালে লুৎফর রহমান মৃত্যুবরণ করলেও তার প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্ক থেমে থাকেনি। তার ভাই ফজলুর রহমান ঢালী ইতালিতে প্রায় ২৯ বছর বসবাস করেন এবং পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিনি একাই নড়িয়া থেকে প্রায় ৫০ জনকে সেখানে নিয়ে আসতে ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন।

এপরবর্তী প্রজন্মের হাত ধরে এই অভিবাসন প্রক্রিয়া এক সফল বাণিজ্যিক উদ্যোগে রূপ নেয়। ফজলুর রহমানের চার ছেলে সুজন ঢালী, সবুজ ঢালী, সজীব ঢালী ও রাজীব ঢালী, বর্তমানে জেনোয়া শহরে একক ও যৌথভাবে ১৯টি রেস্তোরাঁ পরিচালনা করছেন। এর পাশাপাশি হোটেল ব্যবসাতেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন তারা। পরিবারটির ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০০ জন প্রবাসী বাংলাদেশি শেফ, সহকারী ও ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন। সুজন ঢালীর মতে, তাদের পূর্বসূরিরা যে পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন, বর্তমান প্রজন্ম সেই পথ ধরে শুধু ব্যবসাকেই সম্প্রসারিত করেনি, বরং স্বদেশের মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের একটি টেকসই ক্ষেত্রও গড়ে তুলেছে।
বর্তমানে এই বৃহত্তর ঢালী পরিবারেরই প্রায় ১০০ জন সদস্য জেনোয়া শহরে বসবাস করছেন। তারা শুধু পারিবারিক ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন; বরং নগরীর হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন সেবামূলক খাতেও সুনামের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। জেনোয়ার সীমানা পেরিয়ে এই নেটওয়ার্ক এখন রোম, মিলানসহ ইতালির প্রধান শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে প্রবাসীদের নিজস্ব হিসাব মতে, বৃহত্তর নড়িয়া ও এর আশপাশের অঞ্চল থেকে আসা এক হাজারের বেশি মানুষ বর্তমানে ইতালির বিভিন্ন প্রান্তে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, যদিও এর কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পরিসংখ্যান নেই।
বিদেশে অর্জিত এই সাফল্য দেশের অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবনযাত্রাতেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থে নড়িয়ায় তৈরি হচ্ছে পাকা বাড়ি, কেনা হচ্ছে কৃষিজমি, সন্তানদের উচ্চশিক্ষার খরচ মেটানো হচ্ছে এবং বিভিন্ন স্থানীয় ব্যবসায় নতুন বিনিয়োগ করা হচ্ছে। ঢালী পরিবারের হিসাব অনুযায়ী, তাদের পরিচালিত অর্থনৈতিক কার্যক্রম থেকে বছরে প্রায় ১২ লাখ ইউরোর (প্রায় ১৬ কোটি টাকা) লেনদেন হয়। এক ব্যক্তির উন্নত জীবনের স্বপ্ন চার দশক পর দুই দেশের ভৌগোলিক দূরত্ব ঘুচিয়ে নড়িয়ার সঙ্গে জেনোয়াকে এক অবিচ্ছেদ্য ভ্রাতৃত্ব ও সাফল্যের মেলবন্ধনে যুক্ত করেছে।
১৯৮২ সালে একজনের ইতালি যাত্রা থেকে গড়ে ওঠা ধালি পরিবারের নেটওয়ার্কে আজ জেনোয়ায় প্রায় ১০০ সদস্য, ১৯টি রেস্তোরাঁ ও প্রায় ২০০ বাংলাদেশির কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
businesstimes-bd


