জিবুতি উপকূলে অভিবাসীবাহী নৌকাডুবিতে প্রাণহানি বেড়ে ১৩৯, নিখোঁজ ৮৪: নিহতদের মধ্যে ১৫ শিশু

4 Min Read

হর্ন অব আফ্রিকা থেকে ইয়েমেনগামী ‘ইস্টার্ন রুটে’ সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় নিহতদের সবাই ইথিওপিয়ার নাগরিক; লোহিত সাগরে অনুসন্ধান অভিযান চলায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা।

আফ্রিকার দেশ জিবুতি উপকূলে অভিবাসীবাহী একটি কাঠের নৌকা ডুবে অন্তত ১৩৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। সাগরে এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৮৪ জনেরও বেশি আরোহী। লোহিত সাগরের কৌশলগত জলসীমায় উদ্ধারকাজ চলার সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় নিহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)।

সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, কাঠের ওই নৌকায় মোট ৩০৫ জন অভিবাসী ছিলেন, যাদের প্রত্যেকেই ইথিওপিয়ার নাগরিক। গত ৮ ও ৯ অক্টোবরের মধ্যবর্তী রাতে জিবুতির ওবক (Obock) শহরের উত্তরাঞ্চলীয় গুয়েহেরে (Guehere) উপকূলের কাছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নৌকাটি উল্টে যায়। প্রথমে নিহতের সংখ্যা ১০৯ জানানো হলেও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সাগরে তল্লাশি চালিয়ে আরও মরদেহ উদ্ধারের পর তা বেড়ে ১৩৯-এ দাঁড়ায়। উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে অন্তত ১৫টি শিশু রয়েছে, যাদের মধ্যে ৯ জন কন্যাশিশু ও ৬ জন ছেলেশিশু। এছাড়া প্রাপ্তবয়স্কদের মরদেহের মধ্যে ৫২ জন পুরুষ এবং ৪২ জন নারীর মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে।

ভয়াবহ এই বিপর্যয় থেকে ৬৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাদের তাৎক্ষণিকভাবে ওবকে অবস্থিত আইওএম-এর মাইগ্র্যান্ট রেসপন্স সেন্টারে (MRC) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তাদের জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। জিবুতির স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও কোস্টগার্ড সাগরে নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রেখেছে। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নিখোঁজদের জীবিত পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে উদ্ধারকারী দলগুলো।

এই দুর্ঘটনাকে এক অপূরণীয় মানবিক ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন জিবুতিতে আইওএম-এর মিশন প্রধান আলেকজান্দ্রে কোয়াসাক। তিনি জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি এবং স্বজন হারানো পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি ও কাজের সন্ধানে বের হওয়া অভিবাসীরা এই পথে কতটা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েন, এ ট্র্যাজেডি তারই এক নির্মম চিত্র তুলে ধরেছে।

আফ্রিকার শিং বা ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চল থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের দিকে যাওয়া এই জলপথটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘ইস্টার্ন রুট’ (Eastern Route) নামে পরিচিত। আইওএম-এর ‘মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্ট’-এর নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই এই পথ ব্যবহার করতে গিয়ে ৯০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু অথবা নিখোঁজের ঘটনা ঘটে। প্রাণঘাতী ঝুঁকি সত্ত্বেও গত এক বছরে এই রুটে মানুষের যাতায়াত অন্তত ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে চলতি বছরের মার্চেও (২০২৬) একই রুটে অন্য একটি নৌকাডুবিতে ৯ জনের মৃত্যু এবং ৪৫ জন নিখোঁজ হন। এছাড়া গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত কেবল ইথিওপিয়া থেকেই ২০ হাজারের বেশি মানুষ উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী দেশগুলোতে প্রবেশের লক্ষ্যে জিবুতিতে পাড়ি জমিয়েছেন।

আইওএম আরও সতর্ক করেছে যে, উত্তাল সমুদ্রপথ কোনোভাবে পাড়ি দিয়ে ইয়েমেন উপকূলে পৌঁছাতে পারলেও অভিবাসীদের বিপদ শেষ হয় না। সেখানে পা রাখার পর তাদের চরম সহিংসতা, নির্বিচার গ্রেপ্তার, আটকে রাখা, জোরপূর্বক শ্রম এবং মানবপাচারের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। দেশটিতে চলমান যুদ্ধাবস্থা ও মানবিক বিপর্যয়ের কারণে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া মানেই অভিবাসীদের জীবন নিরাপদ হওয়া নয় বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।



জিবুতি উপকূলে ৩০৫ অভিবাসীবাহী নৌকাডুবিতে ১৩৯ জনের মৃত্যু, যাদের মধ্যে ১৫ শিশু; ৮৪ জনের বেশি নিখোঁজ, উদ্ধার হওয়া ৬৪ জনকে দেওয়া হচ্ছে জরুরি চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা।

fanpage

Share This Article