সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরে বিপন্ন নৌযান থেকে দফায় দফায় ১৫১ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে অক্ষত অবস্থায় তুলে নিয়েছে সি-ওয়াচ; তবে তাদের নিরাপদে নামাতে জাহাজটিকে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দূরের ইতালীয় বন্দরে পাঠানোর নির্দেশ ঘিরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরের বিপজ্জনক জলসীমায় একাধিক মানবিক অভিযান পরিচালনা করে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ১৫১ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিরাপদে উদ্ধার করেছে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা সি-ওয়াচ। সংস্থাটির মানবিক সহায়তা জাহাজ ‘সি-ওয়াচ ৫’ সম্প্রতি তিনটি পৃথক ধাপে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা এসব মানুষকে নিজেদের হেফাজতে নিতে সক্ষম হয়। তবে সফলভাবে সাগরে এই উদ্ধার তৎপরতা শেষ হলেও জাহাজে আশ্রিত মানুষদের তীরে নামানো নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ইতালির কর্তৃপক্ষ উদ্ধারকৃতদের সুরক্ষায় নিকটবর্তী বন্দর বরাদ্দের বদলে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দূরবর্তী একটি বন্দরে যাওয়ার নির্দেশনা জারি করায় মানবিক সহায়তাকারীদের মধ্যে গভীর অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
সি-ওয়াচের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া তথ্যানুযায়ী, মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে তাদের জাহাজটি তৃতীয় দফার উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করে। সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরে অবস্থিত একটি অফশোর তেল উত্তোলনকেন্দ্রের কাছাকাছি ভাসমান একটি বিপদগ্রস্ত নৌযান থেকে আরও ৭২ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়। এর মধ্য দিয়েই সি-ওয়াচ ৫ জাহাজে আশ্রিত মানুষের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫১ জনে। সংস্থাটির দাবি, উদ্ধারকাজ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে ‘লিবিয়ান নেভি’ পরিচয় দেওয়া একটি পক্ষ তাদের নানা ধরনের হুমকি ও সতর্কবার্তা প্রদান করে। তবে সেই প্রতিকূলতা ও ভীতি উপেক্ষা করেই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নৌযানটিতে থাকা সব মানুষকে নিরাপদে নিজেদের জাহাজে তুলে আনেন উদ্ধারকর্মীরা।
সাগরে উদ্ধার তৎপরতা শেষ হওয়ার পর জাহাজে থাকা মানুষের মৌলিক অধিকার ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতালির কাছে একটি নিরাপদ ও নিকটবর্তী আশ্রয়ের আবেদন করা হয়। তবে ইতালির সরকারের পক্ষ থেকে সি-ওয়াচ ৫-কে দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় উপকূলের চিভিতাভেকিয়া বন্দরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। উদ্ধারস্থল থেকে সংশ্লিষ্ট বন্দরটির দূরত্ব প্রায় ৯০০ কিলোমিটার। উদ্ধারকারী দলের হিসাব অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে নির্ধারিত বন্দরে নোঙর করতে জাহাজটির একটানা প্রায় তিন দিন সময় লাগবে। সাগরে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে উদ্ধার পাওয়া মানুষদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইতালির এই সিদ্ধান্তকে গভীর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়ে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে সি-ওয়াচ কর্তৃপক্ষ। তাদের অভিযোগ, ভূমধ্যসাগরে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্ধার কার্যক্রমকে পদ্ধতিগতভাবে মন্থর এবং অকার্যকর করতে রোম প্রশাসন জেনেবুঝে দূরবর্তী বন্দর বরাদ্দের কৌশল অবলম্বন করছে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে জানায়, সমুদ্র থেকে বিপদগ্রস্ত মানুষকে উদ্ধার করা থেকে মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে বিরত রাখতে ইতালি সরকার দূরত্বকে একটি ‘কৌশলগত অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে। জাহাজে আশ্রিতদের মানবিক দিক এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে কাছাকাছি কোনো নিরাপদ বন্দর নির্ধারণের জন্য ইতালীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
উল্লেখ্য, ইউরোপে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো থেকে যাত্রা করা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগর বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সমুদ্রপথ হিসেবে চিহ্নিত। প্রতি বছর উন্নত জীবনের আশায় লিবিয়া, তিউনিসিয়াসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ ছোট ছোট কাঠের কিংবা রাবারের নৌযানে করে ইউরোপের উদ্দেশে রওয়ানা হন। সাগরে চলার সম্পূর্ণ অনুপযোগী এবং ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই এসব নৌযান প্রায়ই মাঝসমুদ্রে উল্টে যায় কিংবা বিকল হয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়।
এ ধরনের বিপর্যয় রোধে সাগরে নিয়মিত টহল ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সি-ওয়াচের মতো গুটিকয়েক বেসরকারি সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে উদ্ধার করা মানুষদের আশ্রয় প্রদান ও বন্দর বরাদ্দ নিয়ে ইতালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মানবিক সংস্থাগুলোর বিরোধ দীর্ঘদিনের। সি-ওয়াচ জানিয়েছে, দূরবর্তী বন্দরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতার কারণে উদ্ধারকারী জাহাজগুলোকে দিনের পর দিন সাগরে অহেতুক পথ চলতে হয়। এর ফলে সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরের সক্রিয় বিপৎসংকুল অঞ্চলে অবস্থান করার সুযোগ হাতছাড়া হয় এবং বিপদে পড়া অন্যান্য ভাসমান নৌযানের কাছে দ্রুত পৌঁছে নতুন উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়ে।
সি-ওয়াচ-৫-এর তৃতীয় উদ্ধার অভিযানে আরও ৭২ অভিবাসনপ্রত্যাশী উদ্ধার, জাহাজে মোট ১৫১ জন; এরপর ইটালির কর্তৃপক্ষ ৯০০ কিলোমিটার দূরের চিভিতাভেকিয়া বন্দরে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
infomigrants


