প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের রুয়ান্ডায় পাঠাতে ইউরোপীয় পাঁচ দেশের তোড়জোড়; ২০২৭ সালে চালুর পরিকল্পনা

4 Min Read

আবেদন বাতিল হওয়া অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য ইউরোপের বাইরে ‘রিটার্ন হাব’ তৈরির এই বিতর্কিত উদ্যোগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর ঝুঁকি দেখছেন সমালোচকরা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলো থেকে আশ্রয়ের আবেদন চূড়ান্তভাবে বাতিল হওয়া অনিয়মিত অভিবাসীদের ইউরোপের ভূখণ্ডের বাইরে আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায় পাঠানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, গ্রিস ও নেদারল্যান্ডস এই পাঁচ দেশের সমন্বিত পরিকল্পনায় রুয়ান্ডায় প্রথম ‘রিটার্ন হাব’ বা বহির্দেশীয় প্রত্যাবাসন কেন্দ্রটি আগামী ২০২৭ সাল নাগাদ চালু হতে পারে। সংশ্লিষ্ট একাধিক কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব অনিয়মিত অভিবাসীর আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে কিন্তু আইনি বা কূটনৈতিক জটিলতায় সরাসরি নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যাচ্ছে না, তাদের এই কেন্দ্রে পাঠিয়ে ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিরুৎসাহিত করাই মূল লক্ষ্য। মূলত সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে এটি শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। শুরুর দিকে প্রতিটি দেশ থেকে মূলত সীমান্তে আটক হওয়া প্রায় ২০ জন করে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে কিগালিতে পাঠানোর চিন্তা রয়েছে। তবে রুয়ান্ডা প্রশাসন একে প্রথাগত বন্দিশিবির বলতে নারাজ; তাদের দাবি, এটি হবে অভিবাসীদের জন্য পেশাগত প্রশিক্ষণ সুবিধাসম্পন্ন একটি ‘অভ্যর্থনা কেন্দ্র’। চলতি বছরের শেষ নাগাদ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সেপ্টেম্বরে ইউরোপের প্রতিনিধিদল কিগালি সফর করে এবং সম্প্রতি রুয়ান্ডার প্রতিনিধিরাও ব্রাসেলসে বৈঠক করেছেন। আগামী নভেম্বরের মাঝামাঝি অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অনুষ্ঠেয় অভিবাসন সম্মেলনে এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। পুরো প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় কমিশনও পর্যবেক্ষক হিসেবে সম্পৃক্ত রয়েছে।

এদিকে বহুল আলোচিত এই পরিকল্পনা নিয়ে ইউরোপের অভ্যন্তরেই তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ প্রস্তাবটির সরাসরি বিরোধিতা করে জানিয়েছেন, এটি একদিকে যেমন অকার্যকর, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল্যবোধের পরিপন্থি। মানবাধিকার সংগঠন ইউরোপ কাউন্সিল এবং অনিয়মিত অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় কর্মরত আন্তর্জাতিক সংস্থা পিকুম (PICUM) সতর্ক করেছে যে, ইউরোপের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে তৃতীয় কোনো অচেনা দেশে আটকে রাখা অভিবাসীদের চরম মানবিক ও প্রাণনাশের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে। সম্প্রতি রুয়ান্ডা সফর শেষে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য আনা স্ত্রোলেনবার্গ একে একটি ‘গুরুতর ভুল’ সিদ্ধান্ত আখ্যা দিয়ে জানান, সেখানে শরণার্থীদের প্রতি মনোভাবের চরম অবনতি ঘটেছে।

সমালোচকরা রুয়ান্ডার অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। প্রেসিডেন্ট পল কাগামের দেশে ভিন্নমত প্রকাশ কঠোরভাবে দমন করা হয়; ২০২১ সালে কেবল ইউটিউবে সরকারের সমালোচনা করায় সমাজকর্মী আইভোনে ইদামাঞ্জেকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, বিদেশে থাকা বিরোধীদের লক্ষ্যবস্তু করা এমনকি হত্যার ঘটনাতেও দেশটির প্রশাসনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ রয়েছে। সম্প্রতি প্রতিবেশী উগান্ডায় আশ্রয় নেওয়া রুয়ান্ডার এক সাবেক সেনাসদস্যের শিরশ্ছেদ করা মরদেহ উদ্ধার সেই ভীতিকর পরিস্থিতিরই ইঙ্গিত দেয়। ইতিপূর্বে ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে পরবর্তীতে আইনি জটিলতায় কিয়ার স্টারমারের সরকার তা বাতিল করে দেয়। অন্যদিকে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নিজ দেশে ফেরত পাঠানো অসম্ভব এমন ব্যক্তিদের রুয়ান্ডা, উগান্ডা বা এল সালভাদরে পাঠানোর প্রস্তাব করেছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো ভবিষ্যতে রুয়ান্ডার পাশাপাশি উগান্ডা ও উজবেকিস্তানেও এমন প্রত্যাবাসন কেন্দ্র গড়ে তোলার বিকল্প খতিয়ে দেখছে।

২০২৭ সাল থেকে রুয়ান্ডায় চালু হতে পারে ইইউর প্রথম ‘রিটার্ন হাব’, যেখানে নিজ দেশে ফেরানো সম্ভব নয় এমন বহিষ্কৃত অনিয়মিত অভিবাসীদের রাখা হবে ৫ ইউরোপীয় দেশ উদ্যোগী, মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

infomigrants

Share This Article