ইতালির আনকোনায় শিপইয়ার্ড দুর্ঘটনায় দগ্ধ বাংলাদেশি কর্মী কবির মহিদুলের মৃত্যু; ফিনকানতিয়েরির বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা শ্রমিক ইউনিয়নের

4 Min Read

গত ২৯ সেপ্টেম্বর ফিনকানতিয়েরি শিপইয়ার্ডে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়ার পর পিসার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেন প্রবাসী তরুণ; অনিরাপদ সাব-কন্ট্রাক্ট প্রথার বিরুদ্ধে নাগরিক পক্ষ হয়ে আদালতে লড়ার ঘোষণা মেটাল মেকানিক ইউনিয়নের।

ইতালির আনকোনায় ফিনকানতিয়েরি শিপইয়ার্ডে অগ্নিকাণ্ডে গুরুতর দগ্ধ বাংলাদেশি কর্মী কবির মহিদুল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। দীর্ঘ প্রায় এক মাস ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর দেশটির পিসা শহরের বিশেষায়িত বার্ন হাসপাতালে (Centro Grandi Ustionati) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ২৯ বছর বয়সী এই প্রবাসী তরুণ। স্থানীয় মেটাল মেকানিক শ্রমিক ইউনিয়ন ‘ফিওম সিজিআইএল’ (Fiom Cgil) আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর কর্মক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরপরই তাঁর ৫৫ বছর বয়সী তিউনিসীয় সহকর্মী সোফিয়ান বুত্রাও ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আনকোনায় অবস্থিত বিশ্বখ্যাত জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ফিনকানতিয়েরির (Fincantieri) শিপইয়ার্ডে এই দুর্ঘটনা ঘটে। কবির মহিদুল এবং তাঁর তিউনিসীয় সহকর্মী প্রতিষ্ঠানটির মূল কাঠামোর অধীনে থাকা একটি বহিরাগত সাব-কন্ট্রাক্ট বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের (Ditta appaltatrice) হয়ে কাজ করছিলেন। শিপইয়ার্ডের ‘ব্লক কুইন্তা মার্চা’ নামক অত্যন্ত সংকুচিত ও আবদ্ধ একটি স্থানে কাঠমিস্ত্রির (কার্পেন্ট্রি) কাজ করার সময় হঠাৎ করেই সেখানে আগুনের শিখা ছড়িয়ে পড়ে। জায়গাটি অত্যন্ত সংকীর্ণ হওয়ায় এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় আত্মরক্ষার কোনো সুযোগ পাননি এই দুই শ্রমিক।

দুর্ঘটনার পরপরই মারাত্মক দগ্ধ অবস্থায় কবির মহিদুলকে প্রথমে আনকোনা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। শরীরের অধিকাংশ অংশ মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে জরুরিভিত্তিতে পিসার বিশেষায়িত বার্ন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়েছিল। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসে থাকা অবস্থায় চিকিৎসকদের দীর্ঘ চেষ্টা ব্যর্থ করে শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান। নিহত কবির আনকোনার ‘করসো কার্লো আলবের্তো’ এলাকায় সহকর্মীদের সঙ্গে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। তবে তাঁর পুরো পরিবার বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে।

এই মর্মান্তিক মৃত্যুর পর স্থানীয় বিচার বিভাগ তদন্ত জোরদার করেছে। আনকোনার পাবলিক প্রসিকিউটর আন্দ্রেয়া মাজির নেতৃত্বে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে। আইন অনুযায়ী এটিকে অবহেলাজনিত মৃত্যু বা অনৈচ্ছিক নরহত্যা (Omicidio colposo) হিসেবে বিবেচনা করে তদন্ত চলছে। দুর্ঘটনার পরপরই নিহত তিউনিসীয় কর্মীর মরদেহের ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, এখন বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যুর পরও প্রয়োজনীয় আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।

এদিকে কবির মহিদুলের মৃত্যুর পর কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগে ফিনকানতিয়েরি কর্তৃপক্ষের ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়েছে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো। ফিওম সিজিআইএল-এর আনকোনা শাখার সাধারণ সম্পাদক সারা গালাচ্চি গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর এই নির্মম ধারা কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না। অনিয়ন্ত্রিত সাব-কন্ট্রাক্ট ব্যবস্থার ফলেই শ্রমিকদের এমন মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হতে হচ্ছে। তিনি তথ্য দিয়ে জানান, গত তিন বছরের মধ্যে ফিনকানতিয়েরির বিভিন্ন কারখানায় এটি চতুর্থ মৃত্যুর ঘটনা। এই চরম অবহেলার বিরুদ্ধে নিহত শ্রমিকদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে এবং ফিনকানতিয়েরির বিপক্ষে আদালতে নাগরিক পক্ষ (Parte Civile) হিসেবে আইনি লড়াই করার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

দুর্ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টার ধর্মঘট পালন শেষে শিপইয়ার্ডে সাধারণ কার্যক্রম শুরু হলেও প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতালি জুড়ে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বহু বাংলাদেশি শ্রমিক সাব-কন্ট্রাক্ট প্রতিষ্ঠানের অধীনে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করে থাকেন। কবির মহিদুলের মতো তরুণের অকাল প্রয়াণ প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিকে আবারও জোরালো করে তুলেছে।


ইতালির আনকোনা ফিনকানতিয়েরি শিপইয়ার্ডে ২৯ সেপ্টেম্বরের বিস্ফোরণে গুরুতর দগ্ধ বাংলাদেশি শ্রমিক কবির মহিদুল পিসার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন; দুর্ঘটনায় এক তিউনিসীয় সহকর্মীও নিহত হন।

ansa

Share This Article